ঊনিশ শতকের শুরূর দিকেও পৃথিবীর কোনো দেশেই শ্রম সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা বা আইন-কানুন ছিল না। শ্রমিকের রুটি-রূজি নির্ধারিত হতো মালিকের মর্জিমাফিক। মালিক যতক্ষণ খুশি খাটাত, যতটুকু পারত শুষে নিত শ্রমিকদের শ্রম। বিনিময়ে দিত বেঁচে থাকার সামান্য রসদ। উদ্দেশ্য জৈবিক শরীরটা যেন শুধু টিকে থাকে, যেন যন্ত্রের মতো তাকে দিনে ১৪-১৫ ঘন্টা খাটানো যায়।
কিন্তু শোষিত, নিগৃহীত শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের উন্নতির জন্য আন্দোলন শুরূ করলে পুলিশের গুলিতে শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। আজীবন শোষিত শ্রমিকরা জীবনের বিনিময়ে অবশেষে আদায় করতে সক্ষম হয় তাদের ন্যায্য দাবি।
বহু ন্যায্য দাবিকে আইনে পরিণত করতে শ্রমিককে বুকের লাল রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে রাজপথে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে শ্রম সংক্রান্ত আন্তর্জতাকি সংস্থা আইএলও গঠিত হয়। এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে ফ্রান্স এবং জার্মানির পার্লামেন্টে কিছু শ্রম আইন তৈরি করা হলেও সেগুলো ছিল খবুই অপ্রতুল।
বেসরকারি সংগঠনগুলোর দাবির মুখে সুইজারল্যান্ড সরকার ১৯০৫ এবং ১৯০৬ সালে শ্রম সংক্রান্ত প্রথম দুটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করে। গৃহীত হয় পৃথিবীর প্রথম দুটি আন্তর্জাতিক শ্রম কনভেনশন, যার একটি ছিল রাতে শিল্প প্রতিষ্ঠানে নারী শ্রমিকদের কাজ করানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত এবং অপরটি ছিল দিয়াশলাইয়ের কাঠিতে সাদা ফসফরাসের ব্যবহার নিষিদ্ধ সংক্রান্ত। পরে শ্রম সংক্রান্ত আন্তার্জাতিক কনভেনশনগুলো প্রণীত ও গৃহীত হয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মাধ্যমে। আইএলও (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক আন্তর্জাতিক কনভেনশন প্রণয়ন করেছে।
বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে অধিক গুরূত্বপূর্ণ কনভেনশনগুলো হলো-
ক) জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ব্যক্তি ও দণ্ডিত অপরাধীর ক্ষেত্রে এবং যুদ্ধ, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি দুর্যোগে জরূরি প্রয়োজনে এ কনভেনশনের বিধানাবলি প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদেও সর্বপ্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
খ) সংগটিত হওয়ার এবং সংগঠন করার স্বাধীনতা সংক্রান্ত কনভেনশন ১৯৪৮ (কনভেনশন নম্বর ৮৭): এতে সরকারের কোনো রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৭-৩৮ অনুচ্ছেদে এ অধিকার মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সবার জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে। শ্রম সংক্রান্ত বিষয়ে দরকষাকষির জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার দেওয়া হয়েছে ১৯৬৯ সালের শিল্প সম্পর্কিত অধ্যাদেশে।
গ) সংগঠিত হওয়া ও দরকষাকষি করার অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশণ ১৯৪৯ (কনভেনশন নম্বর ৯৮): এ কনভেনশনে সংঘবদ্ধ শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রতিহতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ ও যৌথ দরকষাকষির অধিকার সংক্রান্ত বিধানাবলি অন্তর্ভৃক্ত করা হয়েছে।
ঘ) পেশা ও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য রোধে কনভেনশন ১৯৫৮ (কনভেনশন ১১১): এ কনভেনশনে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ভেদে পেশা ও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য বিরোধী করতে জাতীয় নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঙ) সমান মজুরি কনভেনশন ১৯৫১ (কনভেনশন নম্বর ১০০): একই পরিমাণ কাজের জন্য নারী ও পুরূষের একই পারিশ্রমিক নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে এ কনভেনশনে।
চ) ন্যূনতম বয়স কনভেনশনে ১৯৭৩, কনভেনশন নম্বর ১৩৮): শিশুশ্রম নিরোধ করতে এ কনভেনশন প্রণীত হয়েছে। এত একজন শ্রমিকের কাজে উপযুক্ত হয়ে ওঠার ক্ষেত্র সর্বনিন্ম বয়স ধরা হয়েছে বাধ্যতামূলক শিক্ষা সম্পন্নকরণের বয়স, যা কোনোভাবেই ১৫ বছরের (উন্নয়নশীল দেশে ১৪ বছরের কম বয়েসী শিশুকে কারখানায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারখানা বিধির ৭৬ ধারতেও একই রকম নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে।
শ্রম সংক্রান্ত আন্তর্জতিক কনভেনশনগুলোর অনেক বিধানই বাংলাদেশের আইনে আত্তীকরণ করা হয়েছে, কিন্তু আইনে থাকলেও বিধানগুলো বাস্তবে মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথমত দেশে নারী ও পুরূষের মজুরি সমান নয়। দ্বিতীয়ত, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া মাঝারি ও ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকের সঙ্গে শ্রমিককে দরকষাকষির কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। তৃতীয়ত, মজুরির হার অপর্যাপ্ত এবং চতুর্থত, ঠকানো ও ব্যবহার করা সহজ বলে ১৪ বছরের কম বয়েসী শিশুদের শ্রমিক হিসেবে শিল্প প্রতিষ্ঠানে হরহামেশা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আইন ততদিন কাগজের সাদা পৃষ্ঠায়ই থাকবে, যতদিন না তা বাস্তাবায়নে উপযুক্ত তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান ও মেকানিজম তৈরি করা হবে। বাংলাদেশে এটারই সবচেয়ে বড় অভাব।
শামীম সুফী