১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদে অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন প্রণয়ন করে। কনভেনশনের আলোকে অভিবাসী শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজ নিজ অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হলে ও অনুসরণ করলে অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হবে এবং অভিবাসী শ্রমিকেরা প্রেরণকারী এবং নিয়োগকারী উভয় দেশেরই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের আরও বেশি ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। নিয়োগকারী দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতিতে অভিবাসী শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অক্লান্ত পরিশ্রম করে এসব অভিবাসী শ্রমিক যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে তা দেশের জাতীয় অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ। অন্যদিকে এতে দেশে বেকারত্বের চাপ যেমন কমছে,তেমনিএকটিবিরাটজনগোষ্ঠীদক্ষজনশক্তিতেপরিণতহচ্ছে।
অভিবাসী শ্রমিকেরা স্বার্থসংরক্ষণ করা শ্রমিক প্রেরণকারী এবং নিয়োগকারী উভয় দেশেরই অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিবাসী শ্রমিকের মানবিক বিষয়গুলোকে গুরূত্ব দেওয়া হয় না। শুধু অর্থনৈতিক বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়ায় অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি প্রায়ই অবহেলিত হয়। বিশ্বব্যাপী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণে জাতিসংঘ ১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদে অভিবাসী শ্রমিক এবং পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন প্রণয়ন করে। কনভেনশনের আলোকে অভিবাসী শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজ নিজ অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হলে ও অনুসরণ করলে অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হবে এবং অভিবাসী শ্রমিকেরা প্রেরণকারী এবং নিয়োগকারী উভয় দেশেরই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের আরও বেশি ভূমিকা রাখবে।
জাতিসংঘ কনভেনশন এবং অভিবাসী শ্রমিকের
অধিকার সংরক্ষণে এর গুরূত্ব
অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণ সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশন ৯ পর্বে মোট ৩৯টি অনুচ্ছেদ বিভক্ত। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই কনভেনশন অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই কনভেনশন প্রথমবারের মতো অধিবাসী শ্রমিকদের শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা না করে তাদের সামাজিক অবস্থানকে মূল্যায়ন করেছে এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইন করছে। এই কনভেনশনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১। অভিবাসী শ্রমিকের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, নির্বিশেষে সব অভিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে বৈষম্যহীন-সমান আচরণ করা।
৩। দেশ ত্যাগের আগে থেকে দেশে ফেরা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা।
৪। অনিয়মিত-অনথিভুক্ত অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষা করা।
৫। জাতিসংঘ অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার রক্ষার জন্য কনভেনশন গ্রহণের তারিখ ১৮ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে সারা বিশ্বের অভিবাসী শ্রমিক প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর এই দিবস পালন করে। এই কনভেনশন অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরূত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং অভিবাসী শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিজেদের অধিকার সংরক্ষণের বিষয় এই কনভেনশন অধিকমাত্রায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছে।
কনভেনশ অনুযায়ী
অভিবাসী শ্রমিক কে?
সব অভিবাসীই অভিবাসী শ্রমিক নয়। কনভেনশন অনুযায়ী অভিবাসী শ্রমিক সেই ব্যক্তি, যিনি কোনো একটি দেশের আয় সৃষ্টিকারী কাজে নিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন, নিয়োজিত আছেন কিংবা নিয়োজিত ছিলেন এবং যিনি সেই দেশের নাগরিক নন।
যেসব অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগকারী দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সে দেশে প্রবেশ থাকা এবং কাজ করার অনুমতি পায় তারাই নিয়মিত-রেগুলার অভিবাসী শ্রমিক।
অন্যদিকে যেসব অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগকারী দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সে দেশে থাকছেন এবং কোনো ধরণের আয় করছেন, তাদের অনিয়মিত অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া এমপ্লয়মেন্ট ভিসা, ব্যতীত অন্য যেকোনো ভিসা (যেমন ট্যুরিস্ট) নিয়ে কোনো দেশে প্রবেশ করে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াআয়সৃষ্টিকারীকাজেনিয়োজিতথাকলেতাদেরওঅনিয়মিতঅভিবাসীশ্রমিকবলাহয়।
অভিবাসী শ্রমিকের
পরিবারের সদস্য কারা?
কনভেনশন অনুযায়ী অভিবাসী শ্রমিকের পরিবারের সদস্য হচ্ছে অভিবাসী শ্রমিকের স্বামী বা স্ত্রী, তাদের সন্তান এবং প্রযোজ্য আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্যান্য সদস্য। বিশ্বব্যাপী পরিবারিক সম্পর্কের ভিন্নতাকে এই কনভেনশনে গুরূত্ব দেওয়া হয়েছে। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ-৪ অনুযায়ী, অভিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে বিবাহ অথবা এমন কোনো সম্পর্ক আছে, যাতে প্রচলিত আইনে তাকে বিবাহের সমতুল্য বলে গণ্য করা যায় এমন ব্যক্তিদের এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী স্বীকৃত পোষ্যগণও অভিবাসী শ্রমিকের পরিবারের সদস্য হবে। এই কনভেনশন বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বিশেষ করে নিয়োগকারী দেশে অভিবাসী শ্রমিকরা পরিবারের সদস্যদের অধিকার ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান নিশ্চিত করেছে।
কারা প্রবাসে বসবাস এবং কাজ করা
সত্ত্বেও কনভেনশনের আওতাভুক্ত নয়
ক) আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা বা এজেন্সি অথবা কোনো দেশ দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, যারা নিজ দেশের বাইরে নিয়োগকর্তা দ্বারা নির্ধারিত কাজে নিয়াজিত এবং যাদের ওই দেশে যাওয়া এবং থাকা সাধারণ আন্তর্জাতিক আইন বা বিশেষ আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কনভেনশন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়।
খ) যেসব ব্যক্তি রাষ্ট্র দ্বারা নিজ ভুখন্ডের বাইরে যেকোনো উন্নয়ন বা সহযোগিতামূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত এবং যাদের ওই দেশে যাওয়াএবংথাকাউভয়দেশেরমধ্যেসম্পাদিতকোনোচুক্তিদ্বারানিয়ন্ত্রিতহয়।
গ) যারা বিনিয়োগের জন্য নিজ দেশের বাইরে ভিন্ন কোনো দেশে বসবাস করে।
ঘ) যারা রিফিউজি-শরণার্থী এবং যাদের কোনো দেশের নাগরিকত্ব নেই।
ঙ) ছাত্র এবং প্রশিক্ষাণার্থী।
অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের
সদস্যদের মানবাধিকার
অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই অমানবিক পরিস্থিতির শিকার এবং মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার দলিল বাস্তবায়নে আইন তৈরির সময় অনেক দেশ শুধু নিজ দেশের নাগরিকদের স্বার্থ বিবেচনা করে। এ ক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিক বিশেষ করে অনিয়মিত অভিবাসী শ্রমিকদের বিষয় বিবেচনা করা হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক মানবাধিকার লংঘিত হয়। জাতিসংঘ কনভেনশনে বিদ্যমান অন্য অধিকারগুলো শুধু নিয়মিত অভিবাসী শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য হলেও মৌলিক মানবাধিকার বিষয়ে এই কনভেনশন নিয়মিত এবং অনিয়মিত সব শ্রেণীর অভিবাসী শ্রমিকের সমান মর্যাদা এবং অধিকার দিয়েছে। কনভেনশনে বর্ণিত মৌলিক মানবাধিকারের গুরূত্বপূর্ণ ধারাগুলো হলো-
১।বৈষম্যমূলকআচরণেরশিকারনাহওয়ারঅধিকার।
২। যেকোনো দেশ ত্যাগ করে নিজের দেশে প্রবেশ ও অবস্থান করার অধিকার
৩। জীবন ধারণের অধিকার।
৪।নিরাপত্তাওব্যক্তিস্বাধীনতারঅধিকার।
৫। নির্মমত, অত্যাচার, নিপীড়ন ও অমর্যাদাকর আচরণ বা শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার।
৬। দাসত্ব থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার, বলপ্রয়োগ বা বাধ্যতামূলক শ্রম থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার।
মুক্ত চিন্তা, নীতি, চেতনা এবং ধর্ম স্বাধীনতার অধিকার।
৮। পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ার অধিকার।
৯। স্থাবর বা অস্থাবর বিষয় সম্পত্তি আহরণের অধিকার।
১০।আঘাতবাক্ষতিথেকেমুক্তথাকারঅধিকার।
১১। নিজের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা সংরক্ষণ করার অধিকার।
নিয়মিত অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের
পরিবারের সদস্যদের অন্যান্য অধিকার
এই কনভেনশন নিয়মিত অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বার্থ বিবেচনা করে মানবাধিকারের পাশাপাশি অন্যান্য বিশেষ অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এতে শ্রমিক হিসেবে একজন অভিবাসীর যে অধিকারগুলো রয়েছে তা হলো-
* পরিবারের প্রয়োজন ও কর্তব্যের খাতিরে সাময়িকভাবে কাজে অনুপস্থিত থাকার অধিকার।
* চলাফেরার স্বাধীনতা এবং পছন্দমতো স্থানে বসবাসের অধিকার।
* নিয়োগকারী দেশের নাগরিকদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে শিক্ষা, কারিগরি, সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অধিকার।
* চাকরি চুক্তি এবং শ্রম আইন সংক্রান্ত অধিকার-নিয়োগদাতা চাকরি চুক্তি ভঙ্গ করলে নিয়োগকারী দেশের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার অধিকার অভিবাসী শ্রমিকের আছে। এ ক্ষেত্রে একজন অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগকারী দেশের নাগরিকের সমান অধিকার ভোগ করবে। এ ছাড়া আইনের অধীনে একটি উপযুক্ত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল ন্যায্য ও সাধারণ নাগরিক শুনানিরঅধিকারওতাদেরআছে।
চাকরি চুক্তি এবং শ্রম আইন সংক্রান্ত অন্যান্য অধিকারগুলো হলো-
ক) চুক্তিপত্রের শর্তাবলী ব্যর্থতার জন্য দণ্ডিত কারাবাস থেকে মুক্তি।
খ) একই কারণে ওয়ার্ক পারমিট বা কাজ করা বা সে দেশে অবস্থান করার অধিকার থেকে বঞ্চিত না করা।
গ) পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, চাকরির চুক্তিপত্রসহ ভ্রমণ সংক্রান্ত যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ এবং তা নিরাপদে রাখা।
ঘ) কর্মঘন্টা, ওভারটাইম, নিরাপত্তা, সাপ্তাহিক ছুটি, স্বাস্থ্য চিকিত্সা, চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি কারণে নিয়োগকারী দেশের যেকোনো নাগরিকের সমান ক্ষতিপূরণ গ্রহণ।
ঙ) চাকরি চুক্তির ক্ষেত্রে নিয়োগকারী দেশের নাগরিকদের মতো সমান অধিকার।
চ) সামাজিক নিরাপত্তা এবং
ছ)তাত্ক্ষণিকস্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তি।
ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত অভিবাসী শ্রমিক
এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার
অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা যেকোনো অভিযোগ অভিযুক্ত হলে তারা নিয়োগকারী দেশের নাগরিকদের মতো একই অধিকার ভোগ করতে পারবে। এই অধিকারগুলো অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে স্বীকৃত। অধিকারগুলো হচ্ছে-
১। আইনের দৃষ্টিতে সব ক্ষেত্রে এবং সবস্থানে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার, জেলে থাকা অবস্তায় মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার।
২। নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং আটকাদেশ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার অধিকার।
৩।আইনগতস্বাভাবিকপ্রক্রিয়াভোগেরঅধিকার।
৪। দ্রুত বিচার নিস্পত্তি এবং সুবিচার পাওয়ার অধিকার।
৫। সুষ্ঠু বিচারের অধিকার, প্রয়োজনীয় আইনগত সাহায্য এবং বিনামূল্যে দোভাষী পাওয়ার অধিকার।
৬। নিচ দেশের অ্যাম্বাসি-দূতাবাস এবং কনস্যুলার অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার।
৭। অভিযুক্ত অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা সাজাপ্রাপ্ত যেকোনো ব্যক্তি থেকে আলাদা থাকার অধিকার।
৮। জেলে থাকা অবস্থায় অন্যের সঙ্গে দেখা করার অধিকার।
৯। অভিযুক্ত কিশোর অভিবাসী শ্রমিকদের অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের কাছ থেকে আলাদা থাকার অধিকার।
১০। জেলে থাকা অবস্থায় জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিজ পরিবার এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের জন্য সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার।
১১। কোর্ট এবং ট্রাইব্যুনালে সে দেশের নাগরিকদের মতো সমান অধিকার পাওয়ার অধিকার।
বহিস্কারের ক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিক এবং
তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার
এই কনভেনশন একজন অভিবাসী শ্রমিককে নিয়োগকারী দেশ থেকে বহিস্কার করতে হলে যে অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিয়েছে সেগুলো হলো-
১। অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগকারী দেশ থেকে শুধু উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের আইনগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বহিস্কার করা যাবে। তবে সিদ্ধান্তটি অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের এমন ভাষায় জানতে দিতে হবে, যে ভাষা তারা বুঝতে পারে।
২। চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অভিবাসী শ্রমিকদের বহিস্কারের বিরূদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার অধিকার আছে।
৩। যদি আদালত বহিস্কারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন তবেঅভিবাসীশ্রমিকএবংতাদেরপরিবারেরসদস্যদেরআইনগতক্ষতিপূরণপাওয়ারঅধিকারআছে।
৪। নিয়োগকারী দেশ থেকে বহিস্কৃত হলে অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা নিজ দেশে না ফিরে অন্য যেকোনো দেশে প্রবেশ করার অধিকার রাখে।
৫। অভিবাসী শ্রমিকদের দলগতভাবে বহিষ্কার করা যাবে না। বহিষ্কার অবশ্যই আদালতের মাধ্যমে মীমাংসিত হতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে আদালত প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।
৬। বহিষ্কারের খরচ বহন করবে না, শুধু ভ্রমণ খরচ বহন করতে হবে।
অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের
সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের ভূমিকা
জাতিসংঘ কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে কোনো আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখে না। অন্য যেকোনো আন্তর্জাতিক দলিলের মতোই এই কনভেনশনের সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। জাতিসংঘ কেবল মাপকাঠি নির্ধারণ এবং নীতি প্রণয়নকারী বা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে এই কনভেনশন শ্রমিক প্রেরণকারী ও নিয়োগকারী উভয় দেশকে বেশ কিছু কর্তব্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এই বিশেষ কর্তব্যগুলো হলো-
প্রেরণকারী দেশের বিশেষ কর্তব্য
-
শ্রমিকদের বিদেশ গমন: বিদেশে চাকরির জন্য চেষ্টারত ব্যক্তিদের দেশত্যগ ও ফিরে আসার অনুমতি দিতে হবে। (অনুচ্ছেদ-৮)
-
দেশত্যাগের আগে তথ্য প্রদান: দেশত্যাগের আগে নিয়োগকারী দেশে প্রবেশ, বসবাস ও কর্মসংস্থান এবং অন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর পূর্ণাঙ্গ তথ্য অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। (অনুচ্ছেদ-৩৭)
-
অভিবাসী শ্রমিকদের রাজনৈতিক অধিকার চর্চা: নিজ দেশের অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ভোটদানে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সহজ এবং নিশ্চিত করতে হবে। (অনুচ্ছেদ-৪১)
-
যথাযথ কনস্যুলার সেবা প্রদানের ব্যবস্থা: নিয়োগকারী দেশে অবস্থানের সময় প্রেরণকারী দেশ অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অন্যান্য প্রয়োজন পূরণের জন্য যথাযথ কনস্যুলার সেবা প্রদান করবে।
-
নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ: অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ মনিটরিংয়ের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সরকারি সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগদানের মধ্যে সীমিত রাখা যেতে পারে অথবা সরকারি তত্ত্বাবধান ও অনুমোদন সাপেক্ষে এ কার্যক্রম বেসরকারি নিয়োগ দানকারী সংস্থা, নিয়োগদাতা ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে ছাড়া যেতে পারে। (অনুচ্ছেদ-৬৫-৬৬)
-
অভিবাসী শ্রমিকের প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী পুর্ণবাসন: অনিয়মিত অভিবাসীসহ সব অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সুষ্ঠভাবে নিজ দেশে ফিরে আসার ক্ষেত্রে অবশ্যই সহযোগিতা করতে হবে। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পূর্ণবাসনের লক্ষ্যে প্রেরণকারী দেশকে অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। (অনুচ্ছেদ-৬৭)
নিয়োগকারী দেশের বিশেষ কর্তব্য
-
ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা: সব অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের (বন্দি বা আটকসহ) ব্যক্তি বিশেষ, সরকারি কর্মচারী, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সহিংসতা বা অন্য কোনো ধরনের হয়রানি থেকে অবশ্যই নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। (অনুচ্ছেদ-১৬ ও ১৭)
-
কর্মস্থল ও বাসস্থানের অবস্থা: অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলের এবং বাসস্থানের অবস্থা অবশ্যই নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং মানুষের ব্যক্তি সম্মানের মূলনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। (অনুচ্ছেদ-৭০)
-
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ: অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বেআইনিভাবে তাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। যদি নিয়োগকারী দেশের আইন অনুসারে তাদের (শ্রমিকদের) সম্পত্তি হূকুমদখল করতে হয়, তবে অবশ্যই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। (অনুচ্ছেদ-১৫)
-
নাগরিকদের সঙ্গে সম-অবস্থান: নিয়োকারী দেশে আদালত বা ট্রাইব্যুনালে অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অবশ্যই সে দেশের নাগরিকদের সমান অধিকার ভোগের সুযোগ দিতে হবে (অনুচ্ছেদ-১৮)
-
ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম: অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য অধিকার সংরক্ষণের জন্য নিয়োগকারী দেশে অবশ্যই ট্রেড ইউনিয়নে এবং সমিতিতে যোগদান বা গঠন করার অনুমতি দিতে হবে। (অনুচ্ছেদ-২৬)
-
ব্যক্তিগত কাগজপত্র সংরক্ষণ: নিয়োগারী দেশকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, অভিবাসী শ্রমিকের পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, কাজ এবং বসবাসের অনুমতিপত্র কোনো অনুমোদনহীন ব্যক্তি দ্বারা বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংস করা হবে না। (অনুচ্ছেদ-২৪)
-
পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন: পরিবারের সঙ্গে ঐক্য রক্ষা প্রয়োজনে নিয়োগকারীর দেশ অভিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করবে (অনুচ্ছেদ-৪৪)।
এ ক্ষেত্রে উভয় দেশ (প্রেরণকারী এবং নিয়োগকারী) অভিবাসী শ্রমিকের পরিবারের পুনর্মিলনে প্রয়োজনীয় এবংযথাযথউদ্যোগগ্রহণকরবে।
বাংলাদেশের অনুসমর্থনের প্রয়োজনীয়তা
পৃথিবীর যেসব দেশ থেকে শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে যায়, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ (১৯৭৬-৯৯)।
অভিবাসী শ্রমিকের এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। অভিবাসনের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশের শ্রম বাজারে প্রবেশাধীকার প্রায় ৮ লাখ কর্মপ্রত্যাশী যুবকের মধ্যে প্রায় অর্ধকের (নিয়মিত ও অনিয়মিত উভয় পথে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ) কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এই বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিকের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা গুরূত্বপূর্ণ অবদান রাখে। (২০০৩-০৪) অর্থবছরে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৩.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিসহ দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অভিবাসী শ্রমিকের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। কাজেই দেশে ও বিদেশে উত্পাদনশীল এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য যথেষ্ট গুরূত্বপূর্ণ।
উল্লেখ, দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইন, আফ্রিকার উগান্ডা, মিসর মরক্কোসহ দক্ষিণ এবং ল্যাটিন আমেরিকার মোট ২৮টি দেশ এই পর্যন্ত এই কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেছে। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘ কনভেনশনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জাতীয় আইন তৈরি করে এসব দেশ নিজ নিজ অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।