একে এম মাসুদ আলী
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় দুই যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। জাতীয় রপ্তানি আয়ের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ আসছে এ ভাগ থেকে। এখানে প্রায় ১৮ লক্ষ শ্রমিক কাজ করছেন, এর মধ্যে প্রায় ১৫ লক্ষ নারী শ্রমিক। আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকটাই নারী। পিছিয়ে থাকা নারী সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রথমবারের মতো ঘরের বাইরে এসে সীমিত পর্যায়ে হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অংশীদারে সক্ষম হয়েছে। বস্তুত নারীর ক্ষমতায়নের সার্বিক প্রচেষ্টার সাথে এ অংশটি নিজেদের যুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করার পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। অথচ যে তৈরি পোশাক শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সে শিল্পে যারা কর্মরত নারী এবং পুরূষ শ্রমিক তাদের কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনা বা উল্লেখযোগ্য কোন গবেশণা হয়নি। এ ব্যাপারে কোন নীতি নির্ধারক, বি জি এম ই, শ্রমিক সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক শ্রম সংস্থাও তেমন নজর দেয়নি। বলা যায় এ দিকটা উপেক্ষিতই রয়েগেছে। এক সময় যার পদচারণা শুরু হয়েছিল হাঁটিহাঁটি পায়ে আজ সে অনক দূর চলে এসেছে। শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ এবং এ সম্পর্কিত অধিকার যা আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের জানতে দেয়া এবং কর্মপরিবেশক উপযোগী করার লক্ষ্যে কাজ করার সময় আসন্ন্। এ ব্যাপারে দৃষ্টি দেয়ার জন্য শ্রমিক সংগঠন, কারখানার মালিক ও সরকারকে কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে।
এ শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার ৮ কর্মঘন্টার জায়গায় ১২ থেকে ১৬ ঘন্টা কাজ করেছে অবলীলায়। তার কর্মপরিবেশ কেমন ঠিক কি পরিবেশে সে কাজ করছে, কীভাবে তারা জীবন-জীবিকার অবিরত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছ, সে দিকটি বোধকরি সবার চোখের আরালে থেকে যাচ্ছে এবং কখনই তা উন্মোচিত হয়নি সেভাবে যেভাবে একান্তই হওয়া উচিত ছিল। এ শিল্পে আই, এল, ও কনভেনশন যে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এ ব্যাপারে যে সকল সাংবিধানিক, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন এবং অধিকার একজন শ্রমিকের জন্য প্রযোজ্য ও স্বীকৃত তারই আলোকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ওয়ার্কাস এন্ড এমপ্লিজ ফেডারেশন ও ইনসিডিন বাংলাদেশ এর যৌথ আয়োজনে সম্পাদিত কর্মশালায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের প্রতিপাদ্য গ্রন্থিত করে এবারের বাণিজ্য উদারীকরণ পর্যালোচনায় প্রকাশ করা হলো। একজন শ্রমিক যে কর্মপরিবেশ দাবি করতে পারে তা কারখানা আইন ১৯৬৫'র নিরাপদ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ১২-৪২ এ বিবৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:- অনুচ্ছেদ:১২: পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অনুচ্ছেদ: ১৩: বর্জ্য নিষ্কাশন ও নির্গমন অনুচ্ছেদ: ১৪: বায়ুগমন, নর্গমন ও তাপমাত্রা অনুচ্ছেদ: ১৫ : ধুলাবালি ও ক্ষতিকর ধোঁয়া অনুচ্ছেদ: ১৬ : কৃত্রিম জলবায়ু অনুচ্ছেদ: ১৭ : অতিরিক্ত লোকের সমাগম অনুচ্ছেদ: ১৮ : আলোর পর্যাপ্ততা অনুচ্ছেদ: ১৯ : খাবার পানীয় অনুচ্ছেদ: ২০ : পায়খানা ও প্রসাবখানা অনুচ্ছেদ: ২২: অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কিত সতর্কতা অনুচ্ছেদ: ২৪: চলমান যন্ত্রপাতির উপরে বা নিকটে কাজ করা অনুচ্ছেদ: ৩৪: ছাদ ও বিভিন্ন তলাসহ মেঝেতে চলাচলের সুযোগ) এর মধ্যে যেগুলো গার্মেন্টস শিল্পের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত অনুচ্ছেদগুলো নিয়ে নিচের আলোচনায় একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অনুচ্ছেদ-১৫: ধুলাবালি ও ক্ষতিকর ধোঁয়া সম্পর্কিত:
উক্ত অনুচ্ছেদে যা বলা হয়েছে তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো প্রত্যেকটি কারখানা যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়া চলছে। যারা দ্বারা ধুলাবলি অথবা অন্য কোন অপরিশোধিত ধরনের কিছু উদগত হয়। যা দ্বারা সেখানে যারা কর্মরত রয়েছে তাদের জন্য ক্ষতিকর হয় তা প্রতিরোধ এবং তা থেকে রক্ষা পাবার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
অনুচ্ছেদ-১৭: অতিরিক্ত জনতার ভিড় সম্পর্কিত:
কোন কারখানায় কাজের কক্ষটি কখনই আকারে এমন হবে না, যাতে করে অতিরিক্ত জনতার ভিড়জনিত কারণে উক্ত কারখানায় কর্মরতদের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে সবিস্তারে অনুচ্ছদ ২-এ ও বি এবং ৩ ও ৪-এ বলা হয়েছে।
অনুচ্ছদ-২০: পায়খানা ও প্রসাবখানা সম্পর্কিত : প্রত্যেক কারখানায় পরিমিত সংখ্যায় পায়খানা ও প্রসাবখানা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে করে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের সুবিধাজনক সময়ে তা ব্যবহারের সুযোগ পায়। এ সম্পর্কে বি সি ডি ই এবং ২ এর-এ বিস্তারিত বিবৃত হয়েছে।
অনুচ্ছদ-২২: অগ্নিকাণ্ডের থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সর্তকতামূলক ব্যবস্থা প্রত্যেক কারখানায় কর্মরতদের বের হওয়ার জন্য বিশেষ রাস্তা বা পথের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে করে কখনও অগ্নিকাণ্ড দেখা দিলে নিরাপদভাবে কর্মরতা বাইরে বের হয়ে আসতে পারে। (২,৩,৪,৫,৬,৭,ও ৮) অনুচ্ছেদে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৪২: বিস্ফোরক ও অগ্নিসহায়ক ধুলা, গ্যাস, ও অন্যান্য: যদি কোন কারখানায় ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়ায় ধুলা গ্যাস ও ধোয়া বা বায়বীর ধরনের কিছু উত্পাদন করে বা উত্পাদনে সহায়তা কে, যা কিনা যে কোন সময়ে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের সহায়ক, সে রকম ক্ষেত্রে সকল ধরনের ব্যবহারিক সতর্কতা ও নিরোধক অবস্থা অবলম্বন করতে হবে।
একজন শ্রমিকের কর্মপরিবেশ সম্পর্কিত অধিকার ও উপরোক্ত আইনগুলো ব্যাতিরেকেও আমাদের সংবিধানে ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে সকল আইন ও অধিকার সংরক্ষিত রয়েছে, তার প্রয়োগিক দিক সম্পর্কে একটু দৃষ্টি দেয়া হলো। বাংলাদেশের সংবিধান ও সামাজিক নিরাপত্তার মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নিন্মোক্ত অনুচ্ছেদে খুঁজে পাওয়া যাবে-
অনুচ্ছদ:১৪: কর্মজীবী (ওয়ার্কাস) ও কৃষকদের সব ধরনের নির্বিঘ্নে কাজ করার স্বাধীনতা
অনুচ্ছদ:১৬: গ্রাম উন্নয়ন এবং কৃষিখাতে বিপ্লব আনয়ন অনুচ্ছদ:১৮: জনস্বাস্থ্য এবং নৈতিকতা অনুচ্ছদ:১৯: সকলের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করণ। অধিকার/আইন শ্রমিকের পক্ষে রয়েছে তার মধ্যে উল্লেযোগ্য: আই এল ও কনভেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তাগুলি নিন্মরূপ:
কনভেনশন অব সোশ্যাল সিকিউরিটি (নিন্মতর মানদণ্ড) ১৯৫২ কনভেনশন অব ইকুয়াল ট্রিটমেন্ট (সামাজিক নিরাপত্তা) ১৯৬২:- বাংলাদেশ সরকার উপরোক্ত দুইটি কনভেনশনের গৃহীত দলিলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, কিন্ত কনভেনশন অব মেইনেটনেন্স অব সোশ্যাল সিকিউরিইট রাইটস-১৯৮২ এখনও স্বাক্ষর করেনি। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তাজনিত যে সমস্ত আইনসমূহ বিদ্যমান রয়েছে সেদিকে কিছুটা দৃষ্টি দেয়া হলো।
প্রভিডেন্ট ফান্ড আইন (ভবিষ্যত্ তহবিল আইন) ১৯২৫-এই আইনটি কর্মজীবী ও চাকরিজীবিদের জন্যে সামাজিক নিরাপত্তাজনিত একটি আইন। গ্র্যাচুইটি (হিতৈষী তহবিল) স্ট্যান্ডিং আদেশ-১৯৬৫-প্রত্যেক কর্মজীবী প্রতি কর্ম বছরে ১৪ দিনের বেতন প্রাপ্য হবেন এবং কাজ শেষে তা গ্রহণ করেত পারবেন।
মুজির প্রদানের আইন-১৯৩৬:- এই আইনের দ্বারা কোন পদ্ধতিতে মজুরি প্রদান করা হবে তা বলা হয়েছে।
দি এমপ্লয়মেন্ট লায়াবিলিটি আইন-১৯৩৮ দি মেটারনিটি বেনিফিট ত্র্যাক্ট ১৯৩৯- এই আইন দ্বারা কর্মজীবী মায়ের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আইনের বলে ছয় সপ্তাহ (৩য় সপ্তাহ মাতৃত্বপূর্ণ এবং ৩য় সপ্তাহ মাতৃত্ব উত্তর) পূর্ণ বেতনে মাতৃত্বজনিত ছুটির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। দি কোম্পানির প্রোফিট ( ওয়ার্কাস পার্টিসিপেশন ত্র্যাক্ট) শীর্ষক আইনটি ১৯৬৮:-এই আইনটি কর্মজীবীদের জন্যে সেফগার্ড হিসেবে কাজ করে। এর দ্বারা তার কোম্পানির নিট লাভের একটা অংশ ভোগ করেত পারবে।
দি ফ্যাটাল একসিডেন্ট ত্র্যাক্ট-১৮৫৫- এই শীর্ষক আইন দ্বারা কর্মপরিবেশের ভূলের কারনে কোন কর্মচারীর মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
আলোচিত সামাজিক নিরাপত্তাজনিত এবং বিদ্যামান আইনসমূহের আলোকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের হালচিত্র: আর,এম,জি, সেক্টরের কেস স্টাডি: ২০০০-২০০১ অর্থবছরে এ শিল্পখাতে রাপ্তানির মাধ্যমে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মূদ্রা অর্জিত হয়েছে যা ছিল মোট জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৭৬% শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, বাংলাদেশের উন্নয়নে রপ্তানিখাত একটি উল্লেযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। তৈরি পোশাক মিল্পখাতে ৩৫০০টি কারখানায় প্রায় ১৬ লক্ষ কর্মজীবী কর্মরত আছেন। কিন্ত এখাতে কর্মরতরা অসম্ভব রকমের পেশাগত বিপদজনক ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে যাচ্ছে যে কারণে অনেক সময় মৃত্যুও ঘটেছে। শিল্পজনিত দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসাবে পরিগণিত হয় অপরিকল্পিত ও অনিয়তান্ত্রিক কারখানা নির্মাণ/স্থাপন। অধিকাংশ কারখানাঘর অত্যন্ত ঝুঁকিবহুল ভয়ষ্কর কর্মপরিবেশ হিসেবে চিহ্নিত থাকে। বিগত এক দশকে এ শিল্পে বড় এবং ছোট মিলিয়ে প্রায় ৫০টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এবং এতে প্রায় দুইশত কর্মরত শ্রমিকরা মারা গিয়েছে এবং প্রায় সহস্রাধিক আহত হয়েছে। অধিকাংশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, টংগী, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ এবং সাভারের আবাসিক এবং বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত। এ ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপনের ক্ষেত্রে ১৯৬৫ সনের কারখানা আইনকে অনুসরণ করা হয়নি।
পেশাগত অসুস্থতা এবং রোগব্যাধিসমূহ : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট এন্ড স্টাডিজ কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে গার্মেন্টস ওয়ার্কাসদের অসুস্থতা ও রোগব্যাধির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাথা, বুক, পেট, চোখ এবং কানে ব্যাথা, শারীরিক দুর্বলতা, খাবারে অরুচি, বমির প্রবণতা, জ্বর, কাশি, টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়েরিয়া, আমাশয়, মূত্রানালী প্রদাহ ও ক্ষত এবং প্রজননজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা। এ ছাড়াও গার্মেন্টস ওয়ার্কাসরা বেশকিছু জটিল রোগে ভোগে। এ ক্ষেত্রে জটিল রোগ বলতে এক বছরের বেশী সময় ধরে আক্রান্ত্র থাকা রোগকে বোজানো হয়েছে। উক্ত সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে যে মহিলা শ্রমিকদের ৪২ শতাংশ এবং তাদের সহযোগী ২৪ শতাংশ পুরূষ শ্রমিক বিভিন্ন ধরণের জটিল রোগে আক্রান্ত তার মধ্যে গ্যাস্ট্রিক ও আন্তপরিপাককতন্ত্র রোগ, রক্তচাপ, মহিলাদের ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতা, যৌনসংক্রমিক রোগ, মূত্রনালী ক্ষতজনিত এবং ঋতু:স্রাবজনিত রোগ অন্যতম।
তৈরি পোশাক শিল্পে পেশাগত ঝুঁকির প্রধান প্রধান কারণ স্বল্প মজুরি:- এ শিল্পে কর্মরতদের কোন ধরনের চুক্তি ব্যাতিরেকে অত্যন্ত সামান্য মজুরিতে কাজ করেত হয় যা তাদেরকে মানিসক চাপ ও নিরাপত্তা হীনতায় ভোগায়। অতিরিক্ত লোকের চাপ/ভিড়:- এ শিল্পে র্কমরতদের জন্য একটি কক্ষে নির্ধারিত ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি সংখ্যায় কাজ করেত হয় যা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর কর্মপরিবেশ তৈরী করে। পিরস্কার পরিচ্ছন্ন প্রসাব পায়খানা ব্যবহারের সুযোগ সুবিধা না থাকা:- এখানে কর্মরত শ্রমিকরা অত্যন্ত নিন্মমানের পায়খানা-প্রসাবখানা ব্যবহার করে থাকে। এমনকি তাদের জন্য কোন বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং পায়খানা-প্রসাবখানা ব্যবহারের জন্য স্বাভাবিক অবস্থা অনুপস্থিত। বায়ু গমন ও নিগর্মনের অপযাপ্ততা: এখানে কর্মকর্তাদের জন্যে যে কক্ষটি বরাদ্দ থাকে তাতে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচলের মত কোন বায়ু গমন-নির্গমন সুবিধা নেই। এর ফলে অধিকাংশ গার্মেন্টস শ্রমিকদের আলোর স্বল্পতা এবং পর্যাপ্ত ভেনটিলেশন সুবিধার অভাবে চোখ ও ফুসফুসের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায় এবং এ সংক্রান্ত রোগের সৃষ্টি হয়।
অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাব:- এ শিল্পে কর্মরতদের সুরক্ষা ও জীবন বাঁচানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনা রোধের প্রস্তুতি সকল কারখানায় অনুপস্থিত। এমনকি এসমস্ত কারখানায় দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার মত কোন জরুরি পথও রাখা হয়নি। ফলে সামান্য অগ্নিকাণ্ডেও প্রাণহানি সংঘটিত হয়েছে একাধিকবার। অতিরিক্ত কাজের (বাধ্যতামূলক অতিরিক্ত কাজ করা): কারখানাগুলোতে অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকে, ফলে শ্রমিকদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেকগুণ বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং এর জন্য অতিরিক্ত মজুরিও ঠিকমত প্রদান করা হয় না। এর ফলে শ্রমিকদের পেশাগত ঝুঁকির কারণে আয়ুষ্কাল কমে আসে। মৌখিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা: এখানে কর্মরতদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সর্বদা মৌখিক এবং শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, যা তার মানসিক এবং শারীরিক চাপকে বৃদ্ধি করে এবং অনেক সময় অসুস্থ করে তোলা। নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা ও সুস্থ বাসস্থানের অভাব:- এখানকার কর্মরতদের কোন নিরাপদ যাতায়ত ব্যবস্থা নেই। যার ফলে তাদের রাস্তাঘাটে সবসময় লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় এবং যেখানে তারা বসবাস করে সেখানে পর্যাপ্ত জায়গাও স্বাস্থ্যকর সুবিধাদির অভাব অত্যন্ত প্রকট। ফলে এ শিল্পে কর্মরতদের সবসময়ই নানারকম মানসিক অসুস্থতা তাড়িয়ে বেড়ায়। এখানে ন্যূনতম শ্রমআইনো বাস্তবায়ন করা হয় না।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বহুজাতিক সংস্থাসমূহের দায়িত্ব ও বিশ্বভাবনা:- আজকের বিশ্বায়ন দ্বিমুখীভাবে বহুজাতিক সংস্থাসমূহের দায়িত্ব ধারণ করে আছে। প্রথমত: উন্নত বিশ্বের ট্রান্স ন্যাশনাল কোম্পানি সমূহের বাণিজ্য ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করে অবাধ মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে এক ধরেনর দায়িত্ব সৃষ্টি করেছে। বিশ্বায়ন বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় দেমসমূহের ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলো (চেইন স্টোরস, ফ্যাশন হাইজস এবং ক্রেতাগোষ্ঠী) আমাদের দেশের তৈরী পোশাক শিল্পের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রাথমিকভাবে অর্জিত মুনাফার সিংহভাগ আয় নিয়ে নিচ্ছে। তারা ক্রেতা হিসেবে শেষ ধাপে না থেকে বিশ্বায়ণের রথচক্রে চেপে এ খাতে বিনিয়োগ এবং মূল সুবিধাভোগী হিসেবে উত্পাদন এবং ভোগকারী হিসেবে কাজ করেছে। এক্ষেত্রে প্রধান যে কোম্পানিগুলোর নাম আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার মধ্যে নাইক, রিবেক, মার্কস এন্ড স্পেনসার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
দ্বিতৃয়ত: বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্টি পুঁজির অবাধ বিচরণ এবং সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক সর্বোচ্চ ফায়দা তোলায় যে প্রক্রিয়া তার সাথে জাতীয় এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সংযোগ এবং এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে অর্জিত মুনাফার অংশগ্রহণের দ্বারা এ ধারায় যুক্ত হওয়া। যা আমাদের বিশ্বাস করা উচিত নয় জাতীয়/দেশীয় উত্পাকগণ এককভাবে গার্মেন্টস খাতে যতাযথভাবে উন্নয়ন ঘটাবে। জাতীয়/দেশীয় উত্পাদকগনই এককভাবে গার্মেন্টস কারখানা শ্রম আইনের দুর্বল বাস্তববায়নের জন্য দায়ী জাতীয় উত্পাদগনই কেবলমাত্র একটি যুগোপোযোগী শ্রম আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে ব্যায়ভার বহন করার সামর্থ্য রাখেন।
কেন আমরা ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে সম্পৃক্ত করেত চাচ্ছি এই ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিসমূহ তৈরী পোশাক শিল্পের উত্পাদন ও ভোগের প্রিক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুনাফার সবচেয়ে বেশি সিংহভাগ নিয়েছে। বিগত দুই দশক ধরে এই সমস্ত ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানি সমূহ শুধুমাত্র বাংলাদেশের সস্তা শ্রম ব্যবহার করে সর্বোচ্চ মুনাফা আদায় করেই ক্ষান্ত থাকেনি বরং তারা বিশ্বব্যাংক ও আই, এম, এফ-এর মাধ্যমে সরকারকে প্রভাবিত করে এ ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমকে বিঘ্নিত ও বাধাগ্রস্ত করেছে এবং কারখানাসমূহে দুর্বল শ্রম আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। আমাদের দেশীয় উত্পাদকগণ পেয়েছে নিন্ম থেকে নিন্মতর ম্যানুফ্যাকচারিং চার্জ (সি,এম) এবং তাদের সময়টা ছিল স্বল্প থেকে স্বল্পতর। যদিও তাদের নিকট অনেক আশা ছিল যে তারা শ্রমিকের অবস্থার ও কারখানার পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে কিন্ত বাস্তবে তা হয়নি। তবে ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এ ব্যবসার মাধ্যমে তাদের মুনাফার অংককে স্ফীত করেছে পুরোপুরি।
তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিতদের উন্নয়নে কে দায়িত্ব বহন করবে?
তৈরি পোশাক শিল্পের দেশীয় উত্পাদকদের সাথে যৌথভাবে তাদের সহযোগী ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে যে এখাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি ও সংশ্লিষ্ট কারখানাসমূহের উন্নয়ন ঘটানো এবং শ্রিমিকদের অধিকারকে অনুধাবন করা। সরকার, আই এল ও বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা ও সহযোগিতার সমন্বয়ে শ্রমিকদের জন্য একটি সুন্দর সামাজিক অবকাঠামো তৈরিতে এবং ট্রান্সন্যশনাল কোম্পানিসমূহ ও তাদের সহযোগীজাতীয়উত্পাদকদেরো সম্পৃক্ত করতে হবে এ প্রক্রিয়ার ।
শেষ সীমানা ২০০৫ সাল- আমরা সবাই জানি ২০০৫ সালে এমএফএ ফেইজ আউট হচ্ছেন। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশকে তার বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে চীন, ভারতের মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে, যাদের উচ্চতর মূল্য সংযোজিত পণ্যসহ প্রতিযোগিতার সামর্থ্য রয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে প্রায় ৮০% তৈরি পোশাক শিল্প কারখানা এর ফলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যদিও কিছু বৃহত্ প্রতিষ্ঠান আশা করছে যে, এম এফ এ ফেইজ আউটের পরে তারা ভাল করেব কিন্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এ পরিবর্তনে শংকিত। কেননা কোন ধরনের পশ্চাত্সংযোগ শিল্প স্থাপনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে।
এমএমএ ফাইজ আউট:- মহিলা শ্রমিকদের ওপর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই সম্পাদিত বেশ কিছু গবেষণা থেকে পাওয়া যায় যে এমএফএ ফেইজ আউট এর ফলে প্রায় ৮০% অর্থাত্ ১৬ লক্ষ মহিলা শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে অর্থাত্ তাদের আয় চলে যাবে। এখানে কর্মরতদের তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত সামর্থ্য নেই যে তারা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান ধরে রাখবে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে।
জীবন-জীবিকার প্রশ্নে এ খাতে কর্মরতদের দাবি - আলোচ্য পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত ১৮ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে যে দাবিগুলো উচ্চারিত হচ্ছে তা হলো:- সরকারকে তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানির মাধ্যমে যে নিট আয় তা থেকে একটা অংশ চিহ্নিত করে, তা এখাতে কর্মরতদের কল্যাণের জন্য তহবিল তৈরি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে সকল প্রকার নীতি পদ্ধতি পরামর্শ ও ত্র্যাডভোকেসির দ্বারা স্টেক হোল্ডার ও ওয়ার্কসদের সংযুক্তির মাধ্যমে ডেলিভারি চ্যানেলের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরতদের ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ নিট রপ্তানি আয়ের ৫% ওয়ার্কাসদের জন্যে বরাদ্দ রাখার এবং এর দ্বারা ওয়ার্কাস কল্যাণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখছে। যার সাহায্যে গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিক ও তাদের উপর নির্ভরশীলদের জন্য সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ, যেমন-স্বল্প খরচে আবাসান ব্যবস্থা, স্কুল এবং স্বাস্থ্য সেবা সুবিধাদি নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করা হবে।
সকল শ্রমিকদের জন্যে সাধারণ কর্মচ্যুতি, অবৈধভাবে কর্ম থেকে বাদ দেয়া, আঘাতজনিত বা অন্যান্য কারণে কর্মচ্যুতির জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ছাড়াও শ্রমিকরা সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছে যে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য, কেননা যখন সরকারি পর্যায়ে কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন যে সকল চুক্তিতে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের। আয়ের সামান্যতম অংশ মুনাফার মাত্র ৫% তাদের জন্য ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং এক্সপোর্ট এসোসিয়েশন (বিজেএমই) তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার সম্প্রসারণও ধরে রাখার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার প্রতি যার ফলে এখাতে কর্মরত শ্রমিকরা সরসরি বাণিজ্য সুবিধা লাভ করতে পারবে বলে তাদরে বিশ্বাস। শ্রমিক নেতৃবৃন্দ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, এ সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে কর্মজীবীদের একটি বৃহত্তর মালিকানা তৈরিতে সহায়তা করেব ও পাশাপাশি বিশ্বে একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি গঠনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।
তৈরি পোশাক শিল্পে এবং বস্ত্র খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এ খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের সরাসরি উপকৃত করবে। এখানে শ্রমিকদের চিহ্নিত খাতসমূহ বিশেষ করে স্বাস্থ্য, আবাসন, যানবাহন, শিল্পে এবং চাকরি উপযোগী প্রশিক্ষণে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা, শ্রমিকদের কর্ম উত্পাদনশীলতা বাড়াবে যার ফলে পুরো শিল্পখাতের উন্নয়ন ঘটবে। অন্যদিকে এর ফলে তৈরি পোশাক শিল্পখাত (বিশেষভাবে বর্তমানে যা বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তি সংকটে ভুগছে)। উদ্যোগক্তাদের এ শিল্পের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ বিশ্বব্যাপী ক্রেতা ও ভোগকারীদের নিকট অনেক বেশি মানবিকভাবে আবেদন রাখতে এবং ভাবমূর্তি গঠনে সহায়তা করবে। সরকারকে নিশ্চিত করেত হবে যে তৈরি পোশাক শিল্পখাতে নিয়োজিত শ্রমিক তাদের অধিকার এবং আইনগত সুরক্ষার। এখানে কর্মরতরা এখনও অপেক্ষা করছে তাদের কাঙ্ক্ষিত আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্রের যা প্রদানে অনীহা তাদের মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করা হচ্ছে, গার্মেন্টস-এর মতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পে।
এ ব্যাপারে শ্রমিকদের যে মানসিকচাপ তা দীর্গদিন চলা উচিত্ নয়, এতে করে এখাতে কর্মরতদের শিল্পের রক্ষায় নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং মানাফায় তাদের অংশগ্রহণ ঘটাতে পারলে সামগ্রিকভাবে এখাতে একটি ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে বলে সকলের বিশ্বাস। এর ফলে আমরা ক্রেতাগণ তাদের প্রতিনিধি এবং অন্যদের উপরেও প্রভাব ফলতে পারবো। এর পাশাপাশি সকলেই আশা করব যে সংশ্লিষ্ট শিল্পের উদ্যোক্তারা তাদের নেতিবাচক মানসিকতা পরিহার করে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়নে সময়ের দাবি অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেবন। এ বিষয়টিতে এখন আর কোন বিতর্কের সুযোগ নেই যিদ ২০০৫ সালে এমএফএ ফেজিং আউট'এর পরবর্তী অবস্থায় এ শিল্পে কর্মরতদের সহযোগিতার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি। আইনগত সুরক্ষা এবং অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এ শিল্পে নিয়োজিতরা জাতীয় শ্রমআইন ও আইএলও সনদ বাস্তবায়নের উপরে সর্বোচ্চ গুরূত্ব আরোপ করছে।
আমরা এখানে পরিষ্কার করতে চাই যে, শ্রমিকদের জন্য আচরণবিধি কোড অব কনডাক্ট কখনই জাতীয় শ্রম আইন বা আইএলও কনভেনশন এর বাদ দিয়ে হওয়া উচিত হবে না। বস্তুত যে কোন আচরণবিধি কোড অব কনডাক্ট প্রাথমিভাবে বিবেচিত হওয়া উচিত জাতীয় শ্রম আইন এবং আই এল ও কনভেনশন দিকে লক্ষ্য রেখে। এ ছাড়া এ শিল্পে কর্মরতদের সরকারের নিকট দাবি জরূরী ভিত্তিতে ট্রেড ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া যার মাধ্যমে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং তাদের সকল কর্মকাণ্ড সম্পৃক্ত হবে। এ সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে সত্যিকার অর্থে একটি কর্যকরী শিল্পখাত হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের জাতীয় পোশাক প্রস্তুতকারক মালিক শ্রেণী এবং তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগী ( বায়িং হাউজ এবং খুচরা বিক্রেতা) যৌথভাবে এ শিল্পে কর্মরতদের প্রিতি কর্পোরেট দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে যদি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার এগ্রিমেন্ট অব টেক্সটাইল এবং ক্লথিং এটিসির কারণে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মচ্যুতি ঘটে তবে তাদের ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে দায়িত্বটা কর্পোরেট দায়িত্ব হিসেবেই নিতে হবে। এ ক্ষতিপূরণ সংগ্রহ করেত দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট দায়ত্ব, পালন করতে হবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার কাঠামোর মধ্য দিয়ে।
কর্পোরেট দায়িত্ব যেভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়া উচিত- কর্পোরেট দায়িত্ব পরিষ্কারভাবে বোঝা ও জানার জন্য বিষয়টির লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, পদ্ধতি এবং সীমা সম্পর্কে আলোকপাত করতে হবে। আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাচ্ছি যে, তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরতদের সামগ্রিক অবস্থার উন্নয়ন ও জীবন জীবিকা নিশ্চয়তা নিতে হবে কর্পোরেট দায়িত্ব হিসেবে। কেননা স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি করে থাকে উন্নত বিশ্বের বড় কর্পোরেট হাউজের জন্যে। উন্নত দেশগুলির কর্পোরেট ক্রিয়ানকগুলি সচলভাবে দায়িত্ব নিতে হবে তাদের স্থানীয় সহযোগী শিল্প মালিকদের নিয়ে। এ শিল্পে কর্মরতদের সার্বিকভাবে অবস্থার উন্নয়ন এবং জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান করা। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলো সিংহভাগ মুনাফা অর্জন করেছেন তৈরি পোশাক শিল্পের বাণিজ্য থেকে। ট্রান্স ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করাতে হবে তাদের কর্পোরেট মুনাফার একটা অংশের উত্স দেশের জন্য বিনিয়োগ করা। বিশেষ করে আমাদের দেশের শ্রমিকমান উন্নয়নের জন্যে আমাদের বাংলাদেশ শ্রমিকদের নিন্মমানের অভিযোগ দেখিয়ে মূলধন সরিয়ে নেওয়ার বর্তমান প্রবণতা পরিহার করতে হবে। ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর শেয়ার হোল্ডার ও তাদের ভোক্তা সাধারণকে নিয়মিত অগ্রগতির চিত্র জানানো উচিত্ যে, তারা যে সমস্ত উত্স দেশ থেকে তাদের পণ্য সংগ্রহ করছে তাদের দেশের শ্রমিক অবস্থার উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য তারা কতটা কাজ করছেন।
কর্মরত শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক দাবি ও সংহতি- তৈরি পোশাক শিল্পে পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি তখনই হতে পারে যখন এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রতি গ্লোবাল কর্পোরেট দায়িত্ব নিশ্চিত হবে। ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব এ শিল্পে কর্মরতদের জন্যে দেশীয় মালিক শ্রেণী, সরকার এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সকলকেই কাজ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে এর সুবিধা শ্রমিকদের নিকট পৌঁছায়। সবশেষে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে উত্তরের দেশসমূহের শ্রমিক, ভোক্তা, ও সুশীল সমাজকে যদি সংহতি ও আন্দোলনে একাত্মতা ঘটানো না যায় তবে ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানি, দেশীয় মালিক শ্রেণী কিংবা সরকার এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা খুবই সামান্যমাত্রায় গূরুত্বপ্রদান করবে, আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদে |