প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

 

সর্বনিন্ম মজুরী ও শ্রমিকের জীবনমান একটি পর্যালোচনা
 
   
 

বিশ্বের চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রমিকের মজুরী ও তার জীবনযাপন মানের স্বরূপ নিয়ে বিতর্ক নিরন্তর। শ্রমিক ও তার শ্রমের বিনিময়ে যে মজুরী প্রাপ্য এবং তার সাথে প্রচলিত বাজার দর ও অর্থনীতির অন্যান্য নিয়ামক বিবেচনায় মজুরী নির্ধারণ নিয়ে একাধিক পদ্ধতি বা ফর্মুলা উপস্থাপনের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান সর্বনিন্ম মজুরী (Minimum wage) উক্ত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে একটি। সর্বনিন্ম মজুরী কি শ্রমিকের সুরক্ষা দেয় বা রক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করেত সক্ষম? এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে বেশ জোরে সোরে। বিশেষ করে যে শ্রমিক সর্বদা চাপের মধ্যে থেকে বিরাজমান সুবিধা ক্ষেত্রের সর্বনিন্ম সারিতে ছোটাছুটি করে এবং যাদের  অবস্থান বিশ্বায়নের পরিবর্তনের হাওয়ার সাথে অবিরতভাবে পরিবর্তন হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে এ সর্বনিন্ম মজুরী কতটা কার্যকর তা একটি অমিমাংসিত জিজ্ঞাসা।

বস্তুত: বিশ্বে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থার প্রয়োগ ও যথার্থতা নিয়ে বিতর্ক খুবই জোরালো। আশির দশকে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচীর অংশ হিসেবে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচী গ্রহণ করার পর থেকে সর্বনিন্ম গ্রহণ করার পর থেকে সর্বনিন্ম মজুরী পদ্ধতি আক্রমনের অধিক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে প্রকাশ্যে। কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচীর প্রবক্তারা যুক্তি তর্কের মাধ্যমে বোঝাতে সচেষ্ট ছিলেন যে সর্বনিন্ম নিয়মবালী/ব্যবস্থা কোনভাবেই গরীব শ্রমিকের অবস্থার পরিবর্তনে সাহায্য করেনা, বা তাদের কোন কাজে আসেনা। তাদের যুক্তির মূল বিষয় হচ্ছে, সর্বনিন্ম মজুরী শুধুমাত্র প্রাতিষ্টানিক সেক্টরে কাজ করে কিন্ত যে শ্রমিক অপ্রাতিষ্টানিক সেক্টরে কাজ করছে তাদের জন্য সর্বনিন্ম মজুরীর সুফল পাওয়ায় সম্ভাবনা খুবই কম। এছাড়াও তাদের মত যদি সর্বনিন্ম মজুরী লাগামহীনভাবে উচ্চ মাত্রায় নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তা কর্মসংস্থানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা চূড়ান্তভাবে আয় বণ্টনের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হবে।

বিশ্বায়নের বর্তমান প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশসমূহ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। সেখানে সর্বনিন্ম মজুরী বা নীতিমালা সে সকল দেশের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ পাবার ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সর্বনিন্ম মজুরীর যে সকল বিতর্ক রয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনায় যাওয়ার আগে সংক্ষিপ্তাকারে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে এর সংজ্ঞা, লক্ষ্য ও ইতিহাসের দিকে। সর্বনিন্ম মজুরী হচ্ছে কাজের জন্য নিন্ম পর্যায়ের পাওনা পরিশোধ যা আইন দ্বারা সৃষ্ট। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ নিন্ম মজুরীর শ্রমিকেদর শোষনের হাত থেকে রক্ষা করা। এটা হলো একটা সময়ভিত্তিক মজুরী যা সাধারণত প্রয়োগ করা হয়ে থাকে অদক্ষ ও বয়স্কদের জন্য যারা প্রথমবারের মতো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। সর্বনিন্ম মজুরী রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা সৃষ্ট। যার ফলে ইহাকে আইনগতভাবে প্রয়োগ ও কার্যকর করার সুযোগ বিদ্যমান।  এ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি যা দ্বারা   শ্রমিকদের দারিদ্র কষাঘাত থেকে রক্ষা করা যায়। এর অর্থ হচ্ছে সর্বনিন্ম মজুরীতে পর্যাপ্ত ক্রয়ক্ষমতার ব্যবস্থা রাখা, যার দ্বারা একজন অদক্ষ শ্রমিক তার মৌলিক জীবন-যাত্রার মান বজায় রাখতে পারে। সর্বনিন্ম মজুরীর অবশ্য অর্থনৈতিক উদ্বুদ্ধকরণ যা দ্বারা সে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগসহ অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব।

সাধারণভাবে বলা যায় যে, সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা প্রথমে ১৮৮৬ সালে নিউজিল্যান্ডে, পরে ১৮৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় এবং ১৯০৯ সালের গ্রেট বৃটেনে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ভারতে ১৯৪৮ সাল সর্বনিন্ম মজুরী ত্র্যাক্ট গ্রহণ করা হয়। এর প্রয়োগ প্রাথমিকভাবে সংক্ষিপ্ত ও সংরক্ষিত ছিল নিন্ম আয়ের খাতগুলোতে নির্দিষ্ট ধরণের শ্রমিকদের মধ্যে যেমন, গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমিক, মহিলা, শিশু এবং আদিবাসী। অর্থাত্‍ তারা বিশেষভাবে বিবেচিত ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে। পরবর্তীকালে উক্ত দেশের আলোকে অনেক উন্নয়নশীল দেশ পরীক্ষামূলকভাবে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্তা চালু করেছিল বিশেষ শ্রেণীর ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। এখানে উদাহরণ হিসেবে এশিয়ার দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এখানে ১৯২৭ সালে সর্বনিন্ম মজুরীর আধ্যাদেশ জারী করা হয়েছিল। অন্যদিকে দিক্ষণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা তাদের নিন্ম আয়ের হোম- ওয়ার্কসদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ১৯১৮ সনে হোমওর্য়াক ত্র্যাক্ট তৈরি করেছিল।

যা হোক কিছু দেশের ব্যাতিক্রমী অবস্থান বাদ দিলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে সর্বনিন্ম মজুরীর নীতি হাতিয়ার হিসেবে খুব সামান্যই ব্যবহৃত হয়েছিল সরকারী নীতিমালার ক্ষেত্রেও। যা শিল্প সমৃদ্ধ এবং উন্নয়নশীল দেশ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ১৯৩০ সনের মহামন্দার শেষের দিকে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী অবস্থায় অধিকাংশ দেশসমূহে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা গৃহীত হতে থাকে দ্রুতলয়ে। সে সময়ে এ প্রবণতার পেছনে সার্বজনীনভাবে শ্রমিকদের সুরক্ষা কাজ করেছে। ১৯২০ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ধারবাহিক শ্রমিক কনভেনশনগুলোতে সর্বনিন্ম মজুরী নীতিমালার প্রাথমিক উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্য কাজ করেছে। এ ব্যাপারে ১৯২৮ সনে অনুষ্ঠিত সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা নির্ধারণের জন্য কনভেনশন ক্রমিক নং-২৬, ১৯৭০ সনে অনুষ্ঠিত সর্বনিন্ম মজুরী নির্ধারণ কনভেনশন নং ১৩১ ছিল উল্লেখযোগ্য।

সর্বনিন্ম মজুরীর তাত্‍পর্য্যপূর্ণ উন্নয়ন ঘটলেও এটা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে, শিল্প সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর সুফল নির্ভর করে আলোচ্য দেশের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং বাস্তব অবস্থার উপর। উদাহরণ হিসেবে এশিয়ার দেশসমূহের কথা বলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, এবং থাইল্যান্ড সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থাকে বিন্যস্ত করেছে বিভাজিতভাবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামে সম্পূর্ণ দেশের জন্য একক সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা চালু আছে। শিল্পোন্নত এবং উন্নয়শীল দেশগুলোতে মূলত: সর্বনিন্ম মজুরী নীতিমালা সামাজিক সমতার নীতি দ্বারা প্রতিফলিত। এর দ্বারা প্রধানত সুরক্ষা দেয়া হয় নিন্ম, অপ্রাতিষ্ঠিনক এবং অদক্ষ শ্রমিকদের যাদের সরাসির কোন পেমেন্ট দেয়া হয়না। যথেষ্ট সুফল থাকা স্বত্ত্বেও বর্তমানে বিশেষজ্ঞ ও নীতি নির্ধারকদের কাছে সর্বনিন্ম মজুরীর কার্যকারিতা একন অনেকটা প্রশ্নের সম্মুখীন। বস্তুত: ১৯৮০'র দশকে শুরূ হওয়া ব্যাপক কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং বেকারত্বের সংকট এই অবস্থানসমূহের মোকাবেলা করতে হচ্ছে উন্নত ও উন্নয়শীল দেশ উভয়কেই। সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত যুক্তিটি হচ্ছে এই যে, সর্বনিন্ম মজুরী একটি নির্দিষ্ট বেকারত্বের কারণ হিসেবে কাজ কের। সুতরাং দারিদ্র দূরীকরণে সর্বনিন্ম মজুরী নীতিমালার কার্যকারিতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত নয় বরং এটা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।

সুনির্দিষ্টভাবে উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে সর্বনিন্ম মজুরী পদ্ধতিতে সমালোচনা করা হয় এই বলে যে, এর দ্বারা অপ্রাতিষ্টানিক সেক্টরের মাধ্যমে কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশ্বের বিভন্ন উন্নয়শীল দেশে সর্বনিন্ম মজুরী পদ্ধতি ও তার সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যান্য উপাদান বিশেষ করে দারিদ্রতা এবং কর্মসংস্থানের উপর এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সাম্প্রতিক সময়ে একটি গবেষনা কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। উক্ত গবেষনায় দেখা গেছে যে, যদি অন্যান্য বিষয়াবলী স্থিতিবস্থা বজায় থাকে তবে সর্বনিন্ম মজুরীর একটি তাত্‍পর্যপূর্ণ প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের উপরে। উক্ত গবেষনার আওতায় ল্যাটিন আমেরিকা দেশগুলোর তথ্য বিশ্লেষনে পরিলক্ষিত যে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত সর্বনিন্ম মজুরী এবং গড় মজুরী দ্বারা তেমন প্রভাবিত হয়না, যতটা প্রভাবিত হয় মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায়। গবেষনা পত্রে আরও প্রকাশিত হয় যে, সংশ্লিষ্ট দেশের জিডিপির একটি স্থায়ী মাত্রা মাথাপিছু আয় এবং গড় মজুরী দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং তা ভৌগোলিক এবং আর্থ সামাজিক ও সংস্কৃতি দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত হতে বাধ্য।

উক্ত গবেষনাপত্রের শেষে সর্বনিন্ম মজুরীর পক্ষে জোরালো মতামতের প্রতিফলন রয়ছে। দারিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থার ফলাফল হচ্ছে পজিটিভ। অর্থাত্‍ দারিদ্র বিমোচনে এ ব্যবস্থা সহায়ক হিসেবে কাজ করে এবং এর ফলে শ্রমিক ও তার পারিবারিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটে যিদও কর্মসংস্থানের বেলায় কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অবশ্য এমন কোন সাক্ষ্য প্রমানাদি নেই যা দ্বারা বলা যায় যে, সর্বনিন্ম মজুরী আপেক্ষিকভাবে গড় মজুরীকে প্রভাবিত করে বিশেষ করে গবেষনায় প্রকাশিত ল্যাটিন আমেরিকান অপ্রতিষ্টানিক খাত ও এর অর্থনীতি'র বিশ্লেষনে।

উন্নয়নশীল দেশসমূহের ক্ষেত্রে উক্ত গবেষণায় বলা হয়েছে যে, দারিদ্র এবং কর্মসংস্থানের আলোকে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা ততটা সহায়ক নয়। এ পর্যায়ে আমরা সর্বনিন্ম মজুরীর বিরূদ্ধে অপর একটি সমালোচনা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। সেটা হচ্ছে যে, প্রায়শই যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে, শিল্প সমূহের মধ্যে বিরাজমান আন্ত: প্রতিযোগীতাকে দূর্বল করার পেছনে কাজ করে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা। কিন্ত বাস্তবতা সেটা সমর্থন করে কিনা? এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের কথা ধরা যেতে পারে। ১৯৯৭-৯৮ সালে এশিয়ায় সম্ভাবনাময় দেশসমূহের চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হওয়ার সময়ে থাইল্যান্ডে খুব জোড়ালোভাবে বিতর্ক ছিল সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে। এক পক্ষ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, উক্ত সময়ে থাইল্যান্ডে শিল্প ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাকে বিপর্যস্ত করেছিল যে সমস্ত উপাদান তার মধ্যে সর্বনিন্ম মজুরী অন্যতম: যার ফলে উক্ত অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। এ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আই.এল.ও) কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় খোজার চেষ্টা হয়েছে সর্বনিন্ম মজুরীর সাথে অর্থনীতির অন্যান্য  পরিবর্তনগুলোর সম্পর্ক। উক্ত গবেষণা পত্রে দেখানো হয়েছে যে, তত্‍কালীন থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে মজুরীর সর্বনিন্মতা শুধুমাত্র কারণ নয়, এর সাথে অর্থনীতির বৃহত্‍ পরিসরে অন্যান্য উপাদান যেমন নির্ধারিত বিনিময় হার এবং উত্‍পাদনশীলতার পতনই মূলত: থাইল্যান্ডের সে সময়ের শিল্প প্রতিযোগিতার পতনের কারণ যা চুড়ান্তভাবে অর্থনেতিক সংকটের দিকে ধাবিত করেছিল।

যদি উত্তম মজুরী কাঠামোকে গরুত্বারোপ করা না হয় তবে এক পর্যায়ে উপরোক্ত বিবেচনা থেকে সরে আসাটা ভূল প্রমানিত হতে পারে। যেমন, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্টানের (শিল্প কারখানা) জন্যে উত্তম মজুরী কাঠামো একটি চক্রযান হিসাবে কাজ করে, যার দ্বারা দক্ষতা উন্নয়ন এবং উত্‍পাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে নিয়োগদাতা এবং শ্রমিক উভয়ের জন্য সর্বনিন্ম মজুরী একটি ফাঁদ বা বাধঁ হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বে থাইল্যান্ডের মেট্রোপলিট্রন এলাকার এবং মেট্রোপলিট্রন এলাকার বিহর্ভূত অঞ্চলের গড় মজুরী ও সর্বনিন্ম মজুরীর আনুপাতিক হার ছিল খুইব উচ্চমাত্রায়, প্রায় ৭০ শতাংশ। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল যে, বহুবছরের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার দিক থেকে সমৃদ্ধ থাকা স্বত্ত্বেও থাইল্যান্ডের শ্রমিক সংগঠনগুলো সর্বনিন্ম মজুরীর অবয়বে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে প্রাপ্ত তথ্যসূত্র ও প্রামানাদি এ বিশ্বাসকে নিশ্চিত করতে সহায়তা যুগিয়েছে। সর্বনিন্ম মজুরী শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করছিলনা, কেননা এ মজুরীর ব্যবস্থায় প্রবর্তন ছিল বিশেষত: অদক্ষ  শ্রমবাজারে নতুনদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য আরেকটি ফলাফল বিবেচনায় রাখা হয়নি, যেটা রাখা উচিত ছিল। বিশেষভাবে বলা যেতে পারে যে নগদ প্রদান এবং তার বিপরীতে প্রাপ্ত যথাযথভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয় তখন মজুরী কার্যক্রম উদ্ভুতকরণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। যদিও সর্বনিন্ম মজুরীর বৃদ্ধি শ্রমিকের জৈষ্ট্যতার ভিত্তিতে পুরস্কার স্বরূপ দেখা যেতে পারে। এর দ্বারা উদ্ধুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া কার্যকর করা সহ মজুরীর উপর প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তখন নগদ পাওনা পরিশোধ ও প্রাপ্তিরর মধ্যে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও কোন বাস্তব সংযোগ ঘটবেনা। একে ভিণ্নভাবে বলা যেতে পারে যখন উচ্চহারে সর্বনিন্ম মজুরী বৃদ্ধির ফলে গড় মজুরী প্রভাবিত হয় এবং আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়, তখন শ্রমিক তার দক্ষতা বাড়াতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে বা কমে যায়। ফলে শ্রম উত্‍পাদশীলতা ব্যাহত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের শিল্প কারখানা ও এন্টারপ্রাইজের নিয়োগকারীগণ বলছেন ভিন্নভাবে। তাদের বক্তব্য হলো, সর্বনিন্ম মজুরী ঢালাওভাবে প্রয়োগ এবং তার অবিবেচজনা প্রসূত বৃদ্ধি, তাদের মজুরী এবং শ্রম বাজার নিয়ন্ত্রনের যে সামর্থ্য তাকে বাধাগ্রস্থ করছে। তাদের জোড়ালো যুক্ত হচ্ছে যে মজুরী কাঠামো নির্ধারণ তাদের অধিকার রয়েছে এবং এ অধিকার মজুরী নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগতভাবে ভিন্নতা প্রদর্শনের সুযোগ রয়েছে যা থেকে তাদেরকে এ সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা বঞ্চিত করেছে। অবশ্য এদের মতামতকে সমর্থন করার পক্ষে কিচু প্রমানাদিও রয়েছে। নিয়োগকারীগণ খুব কমই তাদের মজুরী নির্ধারণের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন সরকারীভাবে ঘোষিত সর্বনিন্ম মজুরীর সাথে সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষেত্রে এবং এই সমন্বয়হীনতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগতভাবে সামগ্রিকভাবে সামগ্রিক লক্ষ অর্জনে অনেকটাই ঋনাত্মক (Negative) মনোভাব তৈরীতে কাজ করেছিল। প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি উত্তম মজুরী কাঠামো নির্ধারণের যে সুযোগ বা অধিকার রয়েছে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের তা পালনের সুযোগ থাকা উচিত। যা দ্বারা আদর্শ মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনানীতি কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। বিশেষ করে বেতনাদি বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়নে উদ্বুদ্ধ করণ এবং উচ্চতর উত্‍পাদনশীলতার জন্য থাইল্যান্ডের দৃষ্টান্ত উক্ত ধারণার গূরুত্বকে অনেকটা প্রভাবিত করে মজুরী ব্যবস্থাপনায়। বস্তুত: যখন প্রতিষ্ঠানগতভাবে শ্রমিকের এবং নিয়োগকারীর দরকষাকরির ক্ষমতা থাকেনা তখন সর্বদা বিপদের আশংকা থাকে যে কোন সময়ে সর্বনিন্ম মজূরী পরিবর্তিত হয়ে কার্যকর সর্বোচ্চ মজুরীতে পরিণত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কম্বোডিয়ার মুধুমাত্র তৈরী পোশাক শিল্প এবং বস্ত্রখাতে যে সমস্ত শ্রমিক নিয়োজিত তাদের জন্য সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা প্রচলিত, যা বর্তমানে মাসিক ৪৫/= ইউএস ডলার মাত্র। সেখানে প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প ইউনিটের স্তরে ক্রিয়াশীল শ্রমিক সংগঠনগুলো সামর্থ্যের দিক থেকে খুবই দূর্বল, অসংগঠিত এবং বিভক্ত। তাদের দিক থেকে শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দবিন্দু হচ্ছে ত্রিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় লেবার কাউন্সিলের  সাথে শুধুমাত্র সর্বনিন্ম মজুরী বাড়ানোর প্রচেষ্টা। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কার্যকরী কোন শ্রমিক আন্দোলন কর্মক্ষেত্রে সৃষ্টি হচ্ছেনা, যেভাবে হওয়া উচিত।

তথাপি কম্বোডিয়ায় শ্রমিক ইউনিয়ন ও সংগঠনগুলো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা এ সামর্থে বাড়ানোর মাধ্যমে প্রাতিষ্টানিক পর্যায়ে একটি কাঙ্খিত লক্ষ অভিমুখে সর্বনিন্ম মজুরীকে নিয়ে যাওয়া যায়। এটা করতে ব্যর্থ হলে শ্রমিক সংগঠনগুলোর জন্য বড় ধরণের বিপদের আশংকা থাকে। কেননা তখন তাদেরকে শ্রমিক সংগঠনের যথার্থতা নিয়ে সদস্যদের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ ও অন্তর্ভুক্তিতে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা তৈরী হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা তখন শ্রমিক সংগঠকদের সাধারণ শ্রমিক সংগঠনের সদস্য হবার উপকারিতা এবং প্রয়োজনীতা বোঝার খুবই কষ্টকর হবে। এহেন পরিস্থিতির এশিয়ার শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সর্বনিন্ম মজুরী এমন একটি ব্যবস্থা করা, যা একটি নির্দিষ্ট স্তরে মজুরী কাঠামোতে সেফটি নেট বা নিরাপত্তা জাল হিসাবে কাজ করবে। অর্থাত্‍ এ ব্যবস্থা নিন্ম আয়ের লোকদের জন্য একটি সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে।

এ কারণে আই.এল.ও প্রকাশনার দেখানো হয়েছে যে, সর্বনিন্ম মজুরী সামান্যতম উর্ধ্বমুখী চাপ এক অর্থনৈতিক প্রভাবসহ মজুরী কাঠামো এবং গড় মজুরী ও মুদ্রাস্ফীতিকে সামান্য প্রভাবিত করতে পারে। অবশ্য এর বিপরীতে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া যেখানে শ্রিমকের ৩০% সর্বনিন্ম মজুরীর সাথেক সরাসরি সম্পৃক্ত, এবং এখানে গড় মজুরী ও সর্বনিন্ম আপেক্ষিক অবস্থান অত্যন্ত নিচুঁ সারিতে। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে সর্বনিন্ম মজুরীর মূল উদ্দেশ্য নিন্ম আয়ের অদক্ষ শ্রমিকের সুরক্ষা দেয়া, যা করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। সর্বনিন্ম মজুরী যদি খুব বেশী কম হয় তাহলে দারিদ্র বিমোচনের যে মুল উদ্দেশ্য তা তখনই অর্জিত হবেনা। দেখা যাবে যে বিকল্প সুযোগের অভাবে শ্রমিক কাজ করছে কিন্ত বাস্তবে দেখা যাবে যে, একটি দেশে বা সমাজে শ্রমিকের কাজ করছে বা কাজ আছে কিন্ত দারিদ্রতা কমছে না। অর্থাত্‍ তাঁরা কাজের মাধ্যমে গরীব (Working poor) থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

উপরোক্ত আলোচনার পরিপেক্ষিতে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সর্বনিন্ম মজুরী নির্ধঅরণ কুবই জটিল এবং দুরূহ কাজ। কোন ধরা-বাধাঁ নিয়মের আলোকে তাকে নির্ধারণ করার সুযোগ খবুই কম। মূলত: সর্বনিন্ম মজুরী ও বৃহত্‍ পরিসরে (Macrolevel) অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ও বাজার কাঠামোতে যে উপাদানগুলো কাজ করছে, তাদের সাথে সক্রিয় থেকেই কাজ করছে। এটা বিরাজমান নিয়মক দ্বারা প্রভাবিত ও নির্ধারিত হয়ে থাকে এবং এটা বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেনা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম হতে পারে ত্রি-পাক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সর্বনিন্ম মজুরী নির্ধারণ করছে। যার ফলে অর্থনীতি স্থিতিশীলতা রক্ষায় এ বিষয়টি অনেক বেশী কার্যকর হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার, শ্রমিক মালিকপক্ষের মধ্যে মজুরী নির্ধারণ পক্রিয়ায় স্বপ্রণোদিতভাবে এবং সমঝোতার মাধ্যমে সর্বনিন্ম মুজরী নির্ধারণ করা উত্তম। যাদের কাছে গুনগত মান সম্পন্ন তথ্য রয়েছে এবং যেখানে অংশীদারগণ সত্যিকার অর্থেই একটি কাঙ্খিত ত্রিপাক্ষীয় ঘোষণা বা অংশগ্রহণ হতে পারে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য লাভজনক।

যদিও অবিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এবং অন্যান্য অংশীদারগণের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশসমূহে এ ধরণের মতবিনিময় বা সমঝোতার চেষ্টায় নানা ধরণের সমস্যা তৈরী হয়। যা মূল লক্ষ্যকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করে। এ ব্যাপারে অবশ্য আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, উন্নয়শীল দেশগুলোতে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর কর্মপরিবেশ এবং দরকষাকষির ক্ষমতা কম এবং দুর্বল, সেক্ষেত্রে ফেডারেশন বা জাতীয়  ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের মাধ্যমে অথবা জোটবদ্ধভাবে সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা চালু করার ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর হাতে অর্থনীতির নিয়ামকগুলির কোন গ্রহণযোগ্য তথ্য থাকেনা যার ভিত্তিতে সর্বনিন্ম মজুরী গ্রহণ ও বিবেচনায় নেয়ার জন্য তারা রাষ্টকে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক তথ্য ও উপাত্ত পাওয়া গেলেও সেক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের যথেষ্ট সামর্থের অভাব রয়েছে, যা দ্বারা সত্যিকার ভাবে একটি তাত্‍পর্য্যপূর্ণ আলোচনায় নিয়ে আসা বা তা প্রয়োগ করা সম্ভবপর হতে পারে। মূলত: আজকে অনেক উন্নয়শীল দেশসমূহে ট্রেডইউনিয়ন সমূহের শক্তি ও সামর্থ্য উন্নয়ন জরূরী কাজ: বিশেষ করে কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির বিবেচনায়।

বছরের পর বছর অনেক আক্রমনাত্মক আলোচনা হয়েছে বিশেষ করে কর্মসংস্থান এবং শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়নে সর্বনিন্ম মজুরীর ভূমিকা নিয়ে। এখানে বলা হয়ে থাকে যে, সর্বনিন্ম মজুরী ব্যবস্থা কাজ কে অদক্ষ শ্রমিকের পক্ষে। আসলে অনেক উপাদান যা অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে, যেখানে বাজার ও অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হচ্ছে সর্বনিন্ম মজুরী নীতি। গবেষণার ভিত্তিতে প্রমানিত যে ১৯৯০'এর দশকের যে বেকারত্ব তার পেছনে সর্বনিন্ম মজুরীর প্রভাব খুব সামান্যই। সর্বনিন্ম মজুরীর ব্যবস্থা একটি নতুন মানব অধিকার পদ্ধতি, যা আলোকিত করে একটি সুন্দর কর্মসংস্থানের অধিকারকে। উন্নয়শীল দেশের নীতি নির্ধারকগণ কর্মসংস্থানের উপর সর্বনিন্ম মজুরীর প্রভাব নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন তেমনি দারিদ্র সীমার উপর এর প্রভাব নিয়েও তারা চিন্তিত। তথাপি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ট্রেড ইউনিয়ন সমূহ সর্বনিন্ম মজুরী পদ্ধতি প্রচলনের জন্য আন্দোলন সংগ্রামে নিবেদিত। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া এবং মূলধনের গতিশীলতার উপর এর বড় ধরণের নিন্মমুখী চাপ পড়ছে। তা স্বত্ত্বেও এটা হচ্ছে এক ধরণের যুদ্ধ সুন্দর কাজের জন্য এবং সকল কাজের মানুষের জন্য (পুরূষ ও মহিলা) এবং যা চলতে থাকবে ও চলবেই।

চ্যাংহি-লি, বিশেষজ্ঞ

আইএলও, ব্যাংকক

অনুবাদ: রফিকুল আলাম