বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মীর। এই লক্ষ্মী উদ্বাস্তু
হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ভিবষ্যত্ ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছন্ন
হয়ে পড়ছে। যেন বা ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে ষ্টিফেন হকিংয়ের Black Hole বা কৃষ্ণ গহ্ববরে
দিকে যেখান থেকে ফেরার কোন উপয় নেই। তথাপি আমরা আশাবাদী এক সুপার অপটিমিষ্ট
কৌতুকের মতো। কৌতুকটি এ রকম- দু'বন্ধুর মধ্যে অনেকদিন পর দেখা। দেখা হতেই এক বন্ধ
হতাশায় চেঁচিয়ে উঠলো, কিরে, তোর মাথায় চুলতো সব উঠে যাচ্ছে। অপর বন্ধু হেসে বললো
তাতে কি কপা তো বড় হচ্ছে।
অল্পতে সন্তষ্ট জাতি হিসেবে আসলেই আমরা আশাবাদী।
তাই শত ঝড়-জাপটার মধ্যে আমাদের আশার প্রদীপ নিভছে না পানি ও গ্লাস নিয়ে বিখ্যাত সেই
প্রবাদটির মতো যেখানে নিরাশাবাদীরা বলে গ্লাসের অর্ধেকটা খালি, আমরা বলি অর্ধেকটা
ভরা এবং স্বপ্ন দেখি বিন্দু বিন্দু জলে সিন্দু সৃষ্টির মতো একদিন গ্লাসের পুরোটা
ভরবে, তাতে সবার তৃষ্ণা মিটবে। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্টিত স্বাল্পোন্নত দেশের
সম্মেলনের ঐক্যবদ্ধ ঘোষণা এই স্বপ্নের ভিত্তিতে আর মজবুত করেছে। বিশ্বের মোট ৪৯টি
স্বল্পোন্ত দেশের মধ্যে ৩৯টি দেশের প্রিতিনিধিরা গত ৩১ মে ঢাকায় তিন দিনের এক
সম্মেলনে অংশ নেন। এই সম্মেলনে মুক্তবাজার ব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশে
অভিন্ন কৌশল নির্ধারিত হয়। ঢাকা ঘোষণা হিসেবে অভিহিত এই জোটবদ্ধ কৌশলের ওপর ভর করে
আগামী সেপ্টেম্বরে মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্টেয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে
স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের ন্যায্য হিসসা আদায়ে সোচ্চার হবে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলো সোচ্চার কেন
ঠিক যখন বিশ্বের এক প্রান্তে (ফ্রান্স) সবচেয়ে
ধনী দেশগুলোর জোট জি-৮এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তখন পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে বসেছে
স্বল্পোন্নত দশগুলোর সম্মেলন। সৌরজগতের নিয়মে একদিকে আলো তো অন্যদিকে আঁধারের
মতোই আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অন্ধকারচ্ছন্ন এই দেশগুলোর আলোচ্য উদ্দেশ্য কৌশল
নির্ধারণ এবং তাতে সহায়তা করার জন্য ওই ধনী দেশগুলোর কাছে একটি জোরালো মেসেজ
পাঠানো।
এ উপলক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরূ মাহমুদ
চৌধুরী সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বলেন, আমাদের স্বার্থের পক্ষে দাবি কোন
উচ্চাকাঙ্খা নয় বরং ন্যায়সঙ্গত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগের অঙ্গীকার পূরণ করেনি।
ফলে একদিকে এলডিসি'র সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্যের আমাদের শেয়ার ব্যাপকভাবে
কমছে। গত দশ'কে যেখানে বিশ্ব বাণিজ্য সার্বিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৮ শতাংশ সেখানে
এলডিসি'র প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশ। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের রফতানির প্রকৃত
মূল্যও কমে গেছে। এভাবে চলতে পারে না। আমরা আমাদের পণ্যের জন্য নিরাপদ, প্রত্যাশিত
এবং অর্থবহ বাজার সুবিধা চাই। সকল পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা চাই।
বাণিজ্যমন্ত্রী স্বল্পোন্নত দেশের অদক্ষ ও
আধাদক্ষ মানুষের বিশ্বে অবাধ যাতায়াতের কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, পুঁজি ও পন্য
অবাধে যেতে পারলে এটা কেন সম্ভব হবে না? তিনি উন্নত বিশ্বের ভর্তুকির কড়া
সমালোচনার করে বলেন, উন্নত দেশগুলো তাদের উন্নত হওয়ার আগে বর্তমানের মতো
ডাব্লিউটিও'র নানা নিয়মের শিকার হয়নি। আমরা যখন কোন শিল্প বা পণ্যের উন্নয়নের জন্য
ভর্তুকি দিতে চাই তখন উন্নত দেশগুলো তা না দেয়ার পরামর্শ দেয়। অথচ তারা তাদের
কৃষিখাতে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে এখনও এ খাতে তাদের প্রতিদিনের ভর্তুকির পরিমাণ এক
বিলিয়ন ডলার! জাপানে একটি গরূ প্রতিদিন সাড়ে সাত ডলার ভর্তুকি পায়। ইউরোপীয়
ইউনিয়নের একটি গরূ প্রায় দুই ডলারের বেশি। অথচ প্রায় ১০০ কোটি মানুষের প্রতিদিনের
আয় এক ডলারেরও কম। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ডাব্লিউটিও'র নীতিমালা কি উন্নত বিশ্বের
স্বার্থ আমাদের মতো দেশের অনগ্রসরদের চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে রক্ষা করছে না?
এমতাবস্থায় বাণিজ্যমন্ত্রী চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে
এলডিসি'র একতার ওপর জোর দেন। মূলত মুক্তবাজার ব্যবস্থার সুষম ব্যবস্থাপনার অভাবে
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বাণিজ্য ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পিছিয়ে পড়েছে। যদিও এই পতনের
ধারা ঠেকানোর লক্ষে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত উরূগুয়ে রাউন্ড নামে দীর্ঘ আলোচনা শেষে
প্রতিষ্ঠা করা হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কিন্ত ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য
বৈষম্য কমেনি। ১৪৬ সদস্যের এই সংস্থাটির নীতি মতে, গরিব দেশগুলোকে বাণিজ্য
সুবিধাসহ অন্যান্য সহায়ক সাহায্য-সহযোগিতা পেতে হলে তাদের বাণিজ্য নীতি উদার করতে
হবে। আর ধনী দেশগুলো বিনিময়ে জিএসপি, কোটা ব্যবস্থা প্রভৃতি উপায়ে বিশেষ সবিধা
দেবে। কিন্ত অর্ধযুগের বেশি সময়ের ফলাফল হচ্ছে এই যে, এই নীতি ধনী দেশগুলোকে আরো
ধনী বানিয়েছে আর গরিব দেশগুলোকে আরো গরীব। এমন হওয়ার কারণ মানবাধিকারের ধ্বজাধারী
ধনী দেশগুলোর জালিয়াতি, যেসব সুবিধা দেয়ার কথা সেগুলো নানান শর্ত ও আইনের
মারপ্যাচে বন্ধ করে দেয়া। তাই উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ১৯৪৭ সালে
প্রতিষ্টিত GATT যা ১৯৯৫ সালে WTO তে রূপান্তরিত হয়, তার মূল কাজ হচ্ছে মুক্তবাজার
অর্থনীতির তত্ত্ব বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুঁজিবাদী বিশ্ব তথা পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষে
গোটা বিশ্ববাজার কুক্ষিগত করায় সহায়তা করা। এজন্যই দেখা যায়, ১৯৭১ সালে
স্বল্পোন্নত দেশের সংখ্যা ২৪টি থাকলেও বর্তমানে তা ৪৯-এ উন্নীত হয়েছে। দেশগুলোর
প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে। ফলে ........তে অন্তর্ভুক্তি তাদের জন্য
শাঁখের করাত হয়ে দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায়, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া স্বল্পোন্নত
দেশগুলো বাধ্য হয়েই তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। অথচ তাদের অবস্থা আগে
এমন ছিল না। এই হতশ্রী বেহাল দশার জন্য দায়ী ওই সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর
লোভ-লালসা লুট-তরাজ। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। দেশান্তরের ইতিহাস।
আজ থেকে ৫০০০ বছর আগেও বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের
অন্যতম সমৃদ্ধিশাল এক জনপদ। পর্যটকরা এ অঞ্চলকে উপমহাদেশের স্বর্গ বলে অভিহিত
করেছেন। আরব সাওদাগররা এ দেশে বাণিজ্যে আসতেন। এ দেশের তৈরি মসলিন কাপড় ছিল ভুবন
বিখ্যাত। বিশ্বের বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানী ও রাজকন্যারা তাদের শোভা বাড়াতে উদগ্রীব
ছিল মসলিনের জন্য। একই রকম চাহিদা ছিল এ দেশের কারূকার্যখচিত আসবাবপত্র। এমনই
স্বয়ং-সম্পূর্ণ ছিল এ দেশ যে, এখানে টাকায় আট মন চাল পর্যন্ত পাওয়া যেতো।
১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ দখল করার পর এ দেশের সমৃদ্ধিতে
ভাটা পড়তে শুরূ করে। শরু হয় প্রান্তিকীকরণ। ১৯৪৭ সালে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের
অঙ্গীভূত হলে শুরূ হয় বাংলাদেশের দারিদ্রকরণের আরেক পর্যায়। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে
কার্যত তাদের উপনিবেশে পরিণত বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণকারী তত্কালীন সবচেয়ে ধনী ২২
পরিবারের একটি পরিবারও বাঙালি ছিল না ফলে গোটা পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলে কোন শিল্প
উদ্যোক্তা গোষ্ঠী গড়ে ওঠেনি।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ী
হওয়ার পর বাংলাদেশ আর একবার লুটের কবলে পড়ে। আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা তাত্ক্ষণিকভাবে
লুট করে নিয়ে যায় বর্তমান বাজার মূল্যে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ। তারা দখন
করে নেয় বাংলাদেশের পাটের আন্তর্জাতিক বাজারও। সবচেয়ে দু:খজনক হচ্ছে, ক্ষমতাসীন
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীও সে সময় লুটপাটে নেমে পড়েছিলেন। তারা লুটে
নেন অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া শিল্প-কারখানা, দোকানপাঠ, ব্যবসা -বাড়ি এবং প্রায় ২০
হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রিলিফের ৭০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশই। ফলে জন্মলগ্নেই
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির মাজা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি গড়ে ওঠে দালাল লুটেরাদের এক
নব্য ধনিক শ্রেণী যাদের দাপট এখন অব্যাহত। এই প্রেক্ষাপটে যে প্রশ্নটি ওঠে তা হচ্ছে-
তাহলে কি বাংলাদেশের উন্নয়নের কোন সম্ভাবনাই নেই? অবশ্যই আছে।
বাংলাদেশের সম্পদ ও সম্ভাবনা
লজ্জার বিষয় হলেও এটা আমাদের স্বীকার করাই সঙ্গত
যে, বৈশ্বিক মানের বাংলাদেশ একটি অনুন্নত দেশ। কারণ সুযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বর
অভাবে এ দেশে টেকসই তেমন কিছুই গড়ে উঠেনি। অথচ এ দেশে প্রাকৃতিক ও জনসম্পদ উভয়েরই
রয়েছে প্রাচুর্য। বাংলাদেশের আছে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর প্রভৃতির মতো
মূল্যবান সম্পদ যার বহুমুখী ব্যবহার করে এ দেশের শিল্পখাতকে চাঙ্গা করা সম্ভব।
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত রয়েছে এ দেশেই যেখানে ইউরেনিয়ম, মোনাজাইট, জিরকন,
সিলিকনসহ মূল্যবান ধাতর পদার্থ পাওয়া যায়। ওই অঞ্চলে লবণ শিল্পের রয়েছে বিশাল
সম্ভাবনা। এ দেশে যদি আধা নিবিড় পদ্ধতির চিংড়ি রফতানি করেই বছরে ১০-১৫ হাজার কোটি
টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। হাজার হাজার পুকুর ও নদীতে মিঠা পানির মাছ
চাষ করেও ঘটানো যায় রূপালী বিপ্লব।
এ দেশের উর্বরা সমতল ভূমিতে যা বোনা হয় তাতেই
সোনা ফলে। শুধুমাত্র শাক-সবজি রফতানি করেই এখন আয় হচ্ছে শত-কোটি টাকা আর বিরান
পাবর্ত্য অঞ্চলসহ সারা বাংলাদেশে যদি সুপরিকল্পিতভাবে সেগুন, মেহগনি ইত্যাদির চাষ
করা যয় তাহলে কাঠ রফতানি করেও বছরে অনায়াসে ১৫-২০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা
আয় সম্ভব। তাছাড়া সারাবছর যে প্রচুর ফলমূল জন্মে তা সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের
মাধ্যমেও হাজার হাজার টাকা আসতে পারে, আসছেও। পাট, চা চামড়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে
অফুরন্ত সম্ভাবনা। সস্তা শ্রমশক্তির কাজে লাগিয়ে এ দেশে যে কোন শিল্প্ই দাঁড়িয়ে
যেতে পারে। যেমন দাঁড়িয়ে গেছে তৈরী পোশাক শিল্প যা এখন ও দেশের সর্বচ্চো বৈদেশিক
মুদ্রা আয়ের সেক্টর। সর্বাধুনিক সফটওয়্যার কাজ থেক শরু করে লাইভষ্টক, ডেইরি
ফার্মিংসহ কৃষিভিক্তক শিল্পের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনা নষ্ট হতে না দিয়
সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতির উন্নয় ত্বরান্বিত করার লক্ষেই বাংলাদেশ
স্বল্পোন্নত দেশের প্লাটফরমে শরিক হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য নিজেদের অধিকার আদায়ের
স্বাথে দিয়েছে ঐক্যবদ্ধ ঘোষণা।
১৩ দাবি সংবলিত ১৬ দফার ঢাকা ঘোষণা
১৩টি সংবলিত ১৬ দফা ঢাকা ঘোষণা সর্বসম্মতভাবে
গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তিনদিনের এলডিসি বাণিজ্য সম্মেলন শেষ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ঢাকা ঘোষণায় বাংলাদেশের প্রস্তাবগুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে এবং
এ দেশ সবচেয়ে লাভবান হবে। সমানের ডাবলীউটিও'র সম্মেলনে ঢাকা ঘোষণার দাবিসমূহ
ঐক্যবদ্ধভাবে তুলে ধরা হবে। তিনি আর বলেন, কোন বিষয়ে সমস্যা দেখা দিলে এককভাবে
কোন আলোচনা করবে না। সমস্যাটি প্রথমে এলডিসিতে আলোচিত হবে এবং এলডিসি
ঐক্যবদ্ধভাবে তা ডাব্লিউটিওতে উত্থাপন করবে।
এলিডিসি'র পক্ষ থেকে উন্নত বিশ্বের কাছে যে ১৩টি
দাবি করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে
১, বিশ্ব বাণিজ্য স্বল্পোন্নত দেশের
বাজার শেয়ার বাড়ানোর লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক, নমনীয় এবং সহজতর রূলস অব
অরিজিন প্রবর্তনের মাধ্যমে এসব দেশের সকল পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত
বাজার সুবিধা দিতে হবে। ২, কানকুন সম্মেলন মেয়াদে সকল বাস্তবায়নযোগ্য
ইস্যু সমাধান এবং স্বল্পোন্নত দেশের প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া ঠেকানোর লক্ষ্যে
স্পেশাল ত্র্যান্ড ডিফারেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট প্রথামর ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে।
৩, মেডে ৪-এর অধীনে পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি প্রদান ভিসা প্রদান, পদ্ধতি সহজ করা
এবং ইকোনমিক নিড টেস্ট-এর প্রশ্ন না তুলে উন্নত দেশের শ্রমের চলাচল বিশেষ করে
অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ সেবাদানকারীদের অস্থায়ী ভিত্তিতে অবাধ যাতায়ত নিশ্চিত করতে হবে।
৪, স্বল্পোন্নত দেশের নিজস্ব অগ্রগতি, আর্থিক ও বাণিজ্যিক চাহিদা কিংবা
প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্টানিক ক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া এবং বাধ্যবাধকতা
পালন করার বিষয়ে নমনীয়তা থাকার বিষয়টি অনুমোদন করতে হবে।
৫, স্বল্পোন্নত দেশের উত্পাদন ও
রফতানিভিত্তিক উন্নয়ন, শিক্তিশালীকরণ, ও বহুমূখীকরণ এবং সেই সঙ্গে প্রাতিষ্টানিক ও
সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়াতে হবে।
৬, অধিকতর অর্থায়নের মাধ্যমে আইএমএফ পদ্ধতি শক্তিশালীকরণ যাতে স্বল্পোন্নত
দেশসমূহ তাদের সাপ্লাই সাইডের বাধাসমূহ দূর করে তাদের রফতানি ভিত্তি সম্প্রসারিত
করেত পারে এবং সেই সঙ্গে আর্থিক সম্পদের অধিকতর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য
বিদ্যমান পদ্ধতি সহজ করতে পারে। ৭, স্বল্পোন্নত দেশসমূহের রফতানিকে
ত্র্যান্টি-ডাস্পিং, কাউন্টার ডেইলিং ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থার আওতায় বাইরে
রাখতে হবে। ৮, এমএফএন শুল্ক কমনোর কারণে অগ্রাধিকার মার্জিন হ্রাস পাওয়ার
বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সমাধানের জন্য যথাযথ ক্ষতিপুরণমূলক পদ্ধতি ও অন্যান্য
কার্যক্রম উদ্ভাবন করতে হবে। ৯, ডাব্লিউটিরও জেনারেল কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত
বিশ্বাবাণিজ্য সংস্থায় স্বল্পোন্নত দেশের প্রবেশাধিকার নীতিমালা দ্রুত কার্যকর ও
পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। ১০, স্বল্পোন্নত দেশের উন্নয়নে সিঙ্গাপুর
ইস্যুর প্রভাব নিরূপণের লক্ষ্যে কারিগরি কার্যক্রম ও সমীক্ষা অব্যাহত রাখতে হবে।
১১, স্বল্পোন্নত দেশকে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে এসব দেশের সহজাত সমস্যা
(যেমন, ক্ষুদ্র অর্থনীতি, চতুর্দিকে ভূমি-বেষ্টিত অবস্থা এবং চরম দুর্দশা)
উত্তরণে কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। ১২, জেনেরিক সম্পদ, প্রচলিত জ্ঞান ও কৃষকের
অধিকার সংরক্ষণ এবং সকল জীবিত বস্তুর স্বত্বাধিকার ট্রিপস চুক্তিতে অন্তর্ভূক্ত না
হওয়া নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক কৌশল বলবত্ রাখতে হবে। ১৩, রোগের
ব্যাপ্তিসীমার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ না করে স্বল্পোন্নত দেশ যারা বাদ্যতামূলক
লাইসেন্সিং পদ্ধতি অনুসরণে সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছে তাদের জন্য একটি বিধিসম্মত
সমাধান নির্ধারণ করতে হবে।
এলডিসির ১৬ দফা ঘোষণার
প্রথম দফায়: ডব্লিউটিওর কানকুন সম্মেলনে অভিন্ন
অবস্থান নেওয়া লক্ষ্যে ঢাকা সম্মেলনে মিলিত হওয়ার কথা বলা হয়।
দ্বিতীয় দফায়: মারাকেশ চুক্তির ভিত্তিতে
প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মূলনীতি ও উদ্দেশ্যের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় এবং
এলডিসির উন্নয়নে চাহিদা পুরণে নিয়মভিত্তক বহু পক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা আর সৃসংগঠিত
হওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
তৃতীয় দফায়: দোহা মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের
অব্যবহিত আগে তাঞ্জানিয়ার জাঞ্জিবারে অনুষ্ঠিত এলডিসি বাণিজ্যমন্ত্রীদের সম্মেলনে
গৃহীত জাঞ্জিবার ঘোষনার প্রতি পুন:প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
চতুর্থ দফায়: উন্নয়ন বিষয়াদিসহ কিছু বিষয়ে
এলডিসির জন্য দোহা মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত সঠিক বাস্তবায়ন ও এ
সংক্রান্ত নির্ধারিত সময়সীমা অনুসরণে ব্যর্থ হওয়ার এবং সে বিষয়ে দোহার ঘোষণাপত্র
অনুযায়ী অগ্রগতি সাধিত না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
পঞ্চম দফায়: বিশ্ব বাণিজ্যে এলডিসির বাজার শেয়ার
ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় পরিপ্রেক্ষিতে সদস্য দেশসমূহ এ সমস্যা নিরসেনর বারবার
তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা সত্ত্বেও বহুপক্ষীয় বাণিজ্যে এলডিসির
মার্জিনালাইজেশন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
ষষ্ট দফায়: বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা ও বিশ্ব
অর্থনীতিতে এলডিসি যাতে উপকৃত এবং কার্যকরভাবে সমন্বিত হতে পারে সে জন্য এলডিসিকে
সহায়তা দেয়ার জন্য মারাকেশ, সিঙ্গাপুর, জেনেভায় অনুষ্ঠিত বাণিজ্যমন্ত্রীদের সভায়
এলডিসির স্বার্থ সংরক্ষণ বিষয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় এলডিসির বিষয়ে ব্রাসেলসে
অনুষ্ঠিত তৃতীয় জাতিসংঘ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়নের ধীরগতিতে হতাশা ব্যক্ত করা হয়।
সপ্তম দফায়: দোহা সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে ট্রিপস
ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট অনুসৃত বিষয়াদি বাস্তবায়নের একটি গ্রহনযোগ্য সমাধান
নির্ধারণে সদস্য দেশগুলো ব্যর্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
অষ্টম দফায়: উন্নত দেশগুলোর তুলার ওপর ভর্তুকি
দেয়ার কারণে আফ্রিকার যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ
করা হয়। এ ভর্তুকির নেতিবাচক প্রভাবের ফলে লাখ লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
এক্ষেত্রে আফ্রিকার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানানো হয়।
নবম দফায়: এলডিসির বাজার প্রাপ্তি সুবিধা বাড়াতে
কিছু দেশের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়।
দশম দফায়: বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতার কারণে এলডিসির
জন্য প্রদত্ত বাজার সুবিধার সামান্য অংশ্ই এসব দেশ কর্তৃক সদ্ব্যবহার করেত পারার
বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
১১তম দফায়: বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থায় এলডিসিকে
একীভূতকরণের লক্ষ্যে অর্থবহ বাজারপ্রাপ্তি, উত্পাদন ও রফতানি ভিত্তি বহুমুখীকরণে
সাহয়তা দান এবং বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট কারিগরি সহায়তা ও সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি
বাণিজ্যমন্ত্রীরা দোহার স্বীকৃতি দেয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
১২তম দফায়: বিদ্যমান স্পেশাল এন্ড ডিফারেন্সিয়াল
ব্যবস্থ অধিকতর সুনির্দিষ্ট ফলপ্রসূ এবং কার্যকর করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হওয়ায়
উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
১৩তম দফায়: কারিগরি সহায়তা কর্মসূচি এবং সমন্বিত
কার্যক্রম ব্যাপকভাবে কার্যকর করার বিষয়ে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
১৪তম দফায়: বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় এলডিসির জন্য
প্রবেশাধিকার নীতিমালাটি ডাব্লিউটিওর সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়ার বিষয়টি লিপিবদ্ধ করা
হয়।
১৫তম দফায়: ১৩টি দাবি উত্থাপন করা হয় এবং ১৬তম
দফায় উপরোক্ত দাবিগুলো কানকুনে অনুষ্টেয় ডব্লিউটিওর সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য
সর্বসম্মত সিদ্ধন্ত হয়।
এখন দেশ গোছানোর সময়
প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্ববাণিজ্যে
ন্যায্য হিসসা ও পক্ষপাতহীন সুবিধাসহ স্বল্পোন্নত দেশসমূহের শেয়ার বাড়ানোর অভিন্ন
লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে এসব দেশের জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একযোগে কাজ করার
ওপর গুরূত্বারোপ করেছেন। স্বল্পোন্নত দেশের সম্মেলনের সমাপনী দিনে প্রদান অতিথির
ভাষণে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অর্থনৈতিক ও
কাঠামোগত সংসকার, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন,
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও আত্মনির্ভরশীতার মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি
অর্জনকে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে। এসবকিছুর মূল্ দারিদ্র বিমোচন। তবে আন্তর্জাতিক
বাজারে পণ্য প্রবেশে বাধা এবং উন্নয়শীল দেশের প্রতি দেশের উন্নত দেশগুলো সাহায্য
প্রবাহ কমে যাওয়ার এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশ Least Developed Country-LDC-র সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণা এলডিসি'র রক্ষাকবচ স্বরূপ। কারণ তাতে
যে ১৩ দফা দাবি তোলা হয়েছে সেগুলো যদি কার্যকরভাবে আদায় করা যায় তাহলে এলডিসি'র
স্বার্থ ও অস্তিত্ব দুটোই রক্ষা পাবে। এ জন্য অবশ্য তাদেরকে অভিন্ন কৌশলে একাট্রা
হয়ে লড়তে হবে। কেননা, যেখানে কথায় বলে, না কাঁদলে নাকি মায়েও দুধ দেয় না, সেখানে
চশমখোর নব্য উপনিবেশবাদীদের কাছ থেকে কিছু আদায় করা বাঘে-মহিষে একঘাটে পানি খাওয়ার
সামান।
এই লড়াইয়ে জোরালো সহায়ক ভূমিকা রাখতে হলে
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পাস্পরিক সংহতির পাশাপাশি প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ
রাজনীতিকে হতে হবে স্থিতিশীল ও উন্নয়মুখী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ নাজুক।
সরকারি ও প্রদান বিরোধী দলের ঘর গোছাতে ব্যস্ত। বিরোধী দলের ঘর গোছানোর
হাঁকডাক শুনলে মনে হয় তারা যে করেই হোক অকালে সরকারের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েই ছাড়বে।
আর সরকারের তোড়জোড় দেখলে মনে হয় তারা যে কোন মূল্যে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করে
মেয়াদ পূর্ণ করবেই। তাদের এহেন যুদ্ধংদেহী অবস্থা মাঝে পড়ে দেশের অবস্থা এখন চরম
অগোছালো। অথচ ২০০৫ সালের বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির পটপরিবর্তনের কথা চিন্তা করলে
তাদের এখন সব বিরোধিতা ভুলে দেশ গোছানোর কথা ।
মশিউর রহমান মহসিন
পাক্ষিক প্রতিচিত্র |