প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

 

ডব্লিউটিও'র কবলে বাংলাদেশ
 
   
 

 

বিশ্বায়নের নামে উন্নত বিশ্ব ক্রমেই অনুন্নত দেশগুলোকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করে ফেলছে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্বের কৃষি, শিল্প, খনিজসম্পদ জীববৈচিত্র্য, মেধাস্বত্বে তারা আদিপত্র বিস্তার করেই চলছে। উন্নত বিশ্বের আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টায় সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা World Trade Organization। অথচ বিশ্বায়ন ও বাণিজ্য উদারীকরণের গতিকে ত্বরান্বিত করে উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের সক্রিয় ও অর্থবহ অংশগ্রহন করার মাধ্যমে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা লক্ষ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গড়ে ওঠে। ৪৭ সালের গ্যাট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভিত রচিত হয়। প্রথম গ্যাট চুক্তিতে ২৩টি দেশ স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি তিনটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠার হয়। বাণিজ্যে থাকবে না কোন উন্নত, অনুন্নত দেশের মধ্যে বৈষম্য। বাণিজ্য সম্পর্ক হবে বহুপাক্ষিক। থাকবে সকলের জন্য সমান সুযোগ গ্যাটের অধীনে এরপর আটবার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। প্রতিটি চুক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, চুক্তির কারণে লাভবান হয়েছে উন্নত দেশ। উন্নয়নশীল দেশের উত্‍পাদিত পণ্যের ওপর আরো নিয়ন্ত্রণ করলেদেখা যাবে, চুক্তির কারণে লাভবান হয়েছে উন্নত দেশ। উন্নয়নশীল দেশের উত্‍পাদিত পণ্যের ওপর আরো নিয়ন্ত্রণ তাদের প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধনী দেশে উন্নয়ণ হয়েছে ত্বরান্বিত। চুক্তির বিধিনিষেধ উন্নয়নশীল দেশের বাণিজ্য গতি প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষ হয়েছে ১৯৮৬ সালে উরূগুয়ে। ৮৬ সালে অনুষ্ঠিত এই রাউন্ডে ১৬৬ দেশ অংশ নেয়।

১৯৯০ সালে ব্রাসেলসে উরূগুয়ে রাউন্ড বৈঠক কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভেঙে যায়। তত্‍কালীন গ্যাট-এর ডাইরেক্টর জেনারেল আর্থার ডাঙ্কেল (Arthur Dunkel) নতুন করে সভা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেন। উরূগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা ও ঝগড়া বিবাদের বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে সকলকে এক জায়গায় আনার জন্য একটি খসড়া ছিল প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠার। আর্থার ডাঙ্কেল ১৯৯১ সালের ২০ ডিসেম্বর সভা ডেকে তার খসড়া প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। তখন ফ্রান্স, জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশসমূহের বিরোধিতার ফলে সমস্ত উদ্যোগ নস্যাত্‍ হয়।

পরবর্তীকালে ডাঙ্কেল তার প্রস্তাবটি সকল দেশের কাছে পাঠান। তিনি বলেন, ১৯৯২ সালের  জানুয়ারি মাসের মধ্যে সব দেশকে এই খসড়া চুক্তিতে সই করতে হবে। তার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে অবশ্য কেউই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। এই খসড়া নিয়ে বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য দরকষাকষির হিসাব-নিকাশ চলে। অবশেষে ১৯৯৩ সালে ১৫ ডিসেম্বর মতৈক্যে পৌঁছায়। সামান্য পরিবর্তন ও সংশোধনের মাধ্যমে ডাঙ্কেল প্রস্তাব গ্রহীত হয়।

১৯৯৪ সালের ১৫ এপ্রিল এক সম্মেলনের মাধ্যমে উরূগুয়ে রাউন্ডের গ্যাট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়্ ১২৪টি দেশ এতে অংশগ্রহণ করে। এই চুক্তি ঐ বছরের ডিসেম্বর থকে কার্যকর করা হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে গ্যাট ১৯৯৫ সালে বিলুপ্ত হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, নামের এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা।

গ্যাট ভেঙে WTO গড়ে উঠলেও প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থে কাজ করার আচরণের পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বায়নের নামে WTO  উন্নয়নশীল বিশ্বের সকল সম্পদের ওপর আধিপত্য বিস্তারে তত্‍পর। এর ফলে অনুন্নত দেশগুলো আরো শৃঙ্খললিত হচ্ছে। আমাদের দেশকেও বিশ্বায়নের নামে ক্রমেই WTO অক্টোপাসের মতো আটকে ধরছে। তারা সাহায্যের নামে, বাণিজ্য উদারীকরণের প্রলোভনের জালে ফেলে নানা ধরনের চুক্তিতে বাংলাদেশকে আবদ্ধ করছে। সরকারগুলো কখনো বুঝে, কখনোবা না বুঝেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে। অথচ এ চুক্তিগুলো সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছে না সংসদে। জনগণ থাকছে পুরো অন্ধকারে।

আগামী ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত হবে ডব্লিউটিওর পঞ্চম মিনিষ্টিরিয়েল কনফারেন্স। এ কনফারেন্সে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের স্বার্থ রক্ষার জন্য ৩১ মে থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর কনফারেন্স। অনুন্নত ৩৮টি দেশ এ কনফারেন্সে অংশগ্রহণের বিষয় নিশ্চিত করেছে। এলডিসি সম্মেলন প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরূ মাহমুদ চৌধুরী ২০০০ কে বলেন, আগামীতে ডব্লিউটিওর মেক্সিকোর কানকুনের মিনিষ্টিরিয়াল কনফারেন্সে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়শীল দেশসমূহ যাতে অভিন্নভাবে অবস্থান নিতে পারি, এ কারণেই এই কনফারেন্স। তবে বিশ্লেষকরা। বলছে না কানকুনের সম্মেলনেও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনবে না। বরং আরো বিধি নিষেধের জালে অবদ্ধ হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাঠামো: ধনী দেশের অনুকুলে  বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হচ্ছে মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। সদস্য দেশসমূহের বাণিজ্য মন্ত্রীরা এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির অধীনে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠিত হওয়ার পর থেকে চারটি মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুরে দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৬ সালের মে মাসে জেনেভায়, তৃতীয়টি অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে সিয়াটলে। চতুর্থ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে কাতারের রাজধানী দোহায় ২০০১ সালে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে বাণিজ্য সংঘাত মেটানোর দায়িত্ব পালন করা। তবে দৈনন্দিন কাজের জন্য একটি সাধারণ পরিষদ রয়েছে। এরই পাশাপাশি আর দু'টি বিভাগ রয়েছে। মামলা মীমাংসার বিভাগ। বাণিজ্য নীতি পর্যালোচনা বিভাগ।

মামলা মীমাংসা বিভাগে একটি আপিল বিচারকমন্ডলী গঠিত হয়। এর সদস্যরা কোনো বিশেষ দেশের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করবেন না। বিরোধ নিস্পত্তি বিভাগ সদস্যদের বাণিজ্যিক বিরোধ নিস্পত্তির আলাপ-আলোচনার ওপর গূরুত্ব দেয়। যদি কোন সদস্য দেশ কোনো আপত্তি উত্থাপন করে তবে তিরিশ দিনের মধ্যে যার বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে সে দেশকে আলাপ-আলোচনার শুরূ করতে হবে। ষাট দিনের মধ্যে যদি বিরোধ নিষ্পত্তি না হয় বা অভিযুক্ত দেশ যদি আলাপ-আলোচনায় না বসে, তবে আপত্তি উত্থাপনকারী দেশ একটি প্যানেল গঠনের আহ্বান জানাতে পারে। এছাড়া অভিযোগকারী পার্টিগুলো অন্যভাবেও সংকট নিরসন করেত পারে। যেমন-সমঝোতা ও সালিশের মাধ্যমে। যদি প্যানেল প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে প্যানেল প্রতিষ্ঠার বিশ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে একটা টার্মস অব রেফারেন্স সম্মত হতে হবে। এ বিশ দিনের মধ্যে যদি প্যানেল গঠনে ঐকমত্য না হয় তখন ডাইরেক্টর জেনারেল সিদ্ধান্ত নেবেনা। প্যানেল সাধারণত তিন ব্যিক্তর সমন্বয়ে গঠিত হয়। তিন ব্যক্তি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অবিজ্ঞতা থাকতে হবে তাদের বিবদমান কোনো দেশেরই নাগরিক হওয়া চলবে না। এই উদ্দেশ্যে গ্যাট সেক্রেটারিয়েট একদল অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের নামের তালিকা সংরক্ষণ করে। এই প্যানেল সাধারণত ছয় মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করবে। জরূরি প্রয়োজনে তিন মাসেও কাজ শেষ করতে পারে। প্যানেল তার রিপোর্ট সদস্যদের মধ্যে বিতরণের ২০ দিনের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি বিভাগ (DSB) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কথা ভাবতে পারে। ইস্যু করার ষাট দিনের মধ্যে যদি বিবদমান কোনো পক্ষের আপত্তি না থাকে বা বিরোধ নিরসন পরিষদ (DSB) সর্বসম্মতিক্রমে রির্পোটটি প্রত্যাখ্যান না করে তবে তা গ্রহন করা হবে। রির্পোট গৃহীত না হয়ে আপত্তি উত্থাপনকারী দেশ আপিলের ঘোষণা দিতে পারে। আপিল সংস্থা গঠিত হবে সাত সদস্যের সমন্বয়ে। আপিল বিভাগ নোটিফিকেশনের ষাট দিনের মধ্যে তার রির্পোট পেশ করবে। বিরোধ নিস্পত্তি বিভাগ আপিল বিভাগের রিপোর্টটি গ্রহণ করবে। সদস্যদের মধ্যে রিপোর্টটি বিতরণের ত্রিশ দিনের মধ্যে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ বিনা শর্তে রায় মেনে নিতে বাধ্য থাকবে। যদি না বিরোধ নিষ্পত্তি পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে রিপোর্টটি প্রত্যাখ্যান করে। কেউ রির্পোট বাস্তবায়ন করতে না চাইলে অন্য দেশ জরিমানা ধার্য বা কনসেশন বাতিল করার আবেদন করতে পারে। রায় বাস্তবায়নের সময়কালের ত্রিশ দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর বিরোধ নিষ্পত্তি বিভাগ শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদণে সম্মতি প্রকাশ করবে। কাগজে-কলমে এটা থাকলেও বাস্তবে কিন্ত এমনটি ঘটছে না। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর। মাসে ভারত সরকার আমদানির পরিমাণের ওপর কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা Apellate Body তে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ভারতের যুক্তি হচ্ছে এই আমদানি নিয়ন্ত্রণ তার দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অর্থাত্‍ বাণিজ্য ঘাটতি মেটাবার জন্যে প্রয়োজন।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীন এমন কোনো নিয়ম নেই যে কোনো দেশ তার নিজ দেশের উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে পারবে না। কাজেই যদি কোনো দেশ মনে করে তার দেশের উন্নয়নের জন্যে আমদানির ওপর সংখ্যা ও পরিমাণগত নিয়ন্ত্রণ দরকার তাহলে সে অবশ্যই তা করতে পারে। অথচ এখানে আইএমএফ ছিল বাদী। তারা বাণিজ্য উদারীকরণ নীতির আওতায় একমাত্র শর্ত মনে করে আমদানি বাড়ানো। ফলে ত্রপিলেট বডি তাদের বক্তব্য শোনার পর রায় দিলো, ভারত আমদানির ওপর যে পরিমাণগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে তা দূর করতে হবে।

চক্রবর্তী রায়বনের প্রণীত এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, সেপ্টেম্বর মাসে ডিস্পিউট সেটেলমেন্ট বডিতে ভারতের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ হচ্ছে যে, তারা ব্যালেন্স অব পেমেন্টের জন্যে আমদানির ওপর পরিমাণগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার নীতি গ্রহণ করছে। মামলা নিষ্পত্তি বিভাগের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ডব্লিউটিও কেবল উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার হরণের জন্যে সব সময় তত্‍পর। এই ঘটনা থেকে আরো বোঝা যায় যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা উন্নত বিশ্বের পক্ষে কাজ করছে। যে কোনো অজুহাতে তৃতীয় বিশ্বের অধিকার হরণ করাই তাদের প্রধান কাজ। বিভিন্ন রাউন্ডে ডব্লিউটিও নানা কৌশলে অনুন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অনৈতিক চুক্তিতে সই করিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।

রূলস অব অরিজিন চুক্তি: হারাতে হবে পোশাক শিল্প

বংলাদেশে পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলোতে Generalized System of Preference (GSP) স্কিমের সুবিধা ভোগ করে। বাংলাদেশকে ইইউ-এর জিএসপি সুবিধা পেতে হলে রূলস অব অরিজিন শর্তাবলী মেনে চলতে হবে। ইইউ রূলস অভ অরজিন উভেন পোশাকের বেলায় একটি দুই ধাপ বিশিষ্ট (সুতা থেকে কাপড়, কাপড় থেকে পোশাক) আর নিট পোশাকের বেলায় তিন ধাপের রূপান্তর (তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড় এবং কাপড় থেকে পোশাক) চুক্তির শর্ত দেয় আছে। যেহেতু এখনো পর্যন্ত সুতা কাটা ও বয়নে বাংলাদেশের নিজস্ব ক্ষমতা সীমিত, সেজন্য রূলস অব অরিজিন চুক্তির ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সমস্যায় পড়বে ইইউ-এর বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ প্রায় ৯০% উভেন কাপড় এবং ৬০% নিটেড কাপড় আমদানি করে। ফলে পোশাক শিল্পের নিশ্চিত ইইউ-এর বাজার হারাতে হবে বাংলাদেশকে। এ জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ স্থাপনে গূরূত্বারোপের পাশাপাশি সময়সীমা বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে হবে। ফলে এক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগের প্রয়োজন।

GATS: বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে সেবা খাত

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধিকাংশ চুক্তিই শিল্পজাত পণ্য বিনিময় সম্পর্কিত এর মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিমালা, সেবাখাতেও সম্প্রসারিত। যেখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ব্যাংকিং থেকে খুচরা দোকান স্থাপন পর্যন্ত। শিল্পোন্নত দেশসমূহের অর্থনীতিতে সেবাখাতের অর্ধেক। সেবাখাতের বানিজ্য বিশ্ব বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ। যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

GATS চুক্তিতে একটি ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো স্থির করা হয়েছে যাতে চুক্তির মৌলিক বাধ্যবাধকতাগুলো সকল সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সমভাবে প্রয়োগ করা যায়। Most Favoured Nation (Article II-এর বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সকল Trading partner ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। এর সময়সীমা দশ বছর। পাঁচ বছর পর পর পর্যালোচনা করে তা ঠিক করতে হবে। এ চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, উন্নয়ণশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তি ও তথ্য চ্যানেলে প্রবেশের সুযোগ দিয়ে, বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সেবা বাণিজ্য অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হবে। যেসব অভ্যন্তরীণ বিধি-নিষেধ সেবা বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে সেগুলো ধীরে ধীরে অপসারণ করতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চুক্তিতে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে দায়িত্ব, লাইসেন্স বা সনদপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যোগ্যতার একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদন্ড মেনে চলার দায়বদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।

National Treatment এবং Market Access-এ দুটো ধারা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশী সেবা ও সেবা প্রদানকারীদের  প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো সব ধরনের বাধা দূর করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। যেমন, কোনো দেশ সেবা বাণিজ্যের মোট সাব প্রদানকারী কোম্পানির সংখ্যা বা সেবা প্রদানের মূল্য সীমা বা সেবা সংস্থায় কর্মীদের সংখ্যা বেঁধে দিতে পারবে না। একই ভাবে সেবা সংস্থা সংক্রান্ত আইনি বিধি-নিষেধ, যা বিদেশী পুঁজি বা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে তা দ্রুত দূর করতে হবে। চিক্তির অধীনে (আলোচনা সাপেক্ষ্যে) সেবাখাতে জনশক্তি স্থানান্তরের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রদানের বিধি রয়ছে। ব্যাংকিং খাত ও টেলিযোগাযোগা খাতে এ চুক্তির বলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও দেশীয় উদ্যোগক্তাদের মতো সমান সুযোগ পাবে।

এ চুক্তি অধীনে বিভিন্ন সেবাখাত যেমন ব্যাংক, বীমা, সংবাদ মাধ্যম, চলচ্চিত্র ইত্যাদি সেবাখাতসমূহের একদেশ থেকে অন্যদেশে ব্যবসা করার বিদি বিধান রয়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এর কাঠামোগত সমবায় কর্মসূচি বা স্যাপের মাধ্যমে দেশে দেশে বেসরকারিকরণের ডামাডোল চলছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। তার আওতায় সেবাখাত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং ইত্যাদিকেও বাণিজ্যের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। সেবা এখন সম্পূর্ণভাবে একটি পন্য। ডব্লিউটিও-তে এ ব্যবস্থার বৈশ্বিকীকরণ। ফলে অন্য যে কোনো খাতের মতো সবাখাতেও বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য হবে। যে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি চুক্তিভুক্ত যে কোনো দেশে সময়ে সুবিধামতো বিনিয়োগ ও বাণিজ্য করতে পারবে। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি সরবাহ ও বিদ্যূতের মতো বিভিন্ন জাতিগঠনকারী খাতেও এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্যান্য চুক্তির সুবিধা যেমন (মধাস্তত্ব অধিকার), ফলে গরিব জনগণ এতদিন রাষ্ট্রের কাছ থেকে যে প্রাথমিক ও মৌলিক সেবাগুলো ন্যূনতম পরিমাণে হলেও পেত, চুক্তি কার্যকর হলে সেই সুবিধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হবে।

WTO এর প্রভাব: এদেশের কৃষিখাত ধ্বংসের পথে

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উত্‍পাদনের (Gross Domestic Product) প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ আসে কৃষি থেকে। জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির এ অবদান অন্যান্য এশীয় দেশগুলোর চাইতে বেশি (পাকিস্তানের জিডিপি-এর ২৫% থাইল্যান্ডের ১০% ফিলিপাইনের ২২% এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশসমূহের জিডিপির ৩০% আসে কৃষি থেকে। এ দেশের শতকরা ৭০ জনেরও বেশি মানুষ গ্রামে বাস করে যাদের প্রধান পেশা কৃষি) দ্রুত নগরায়ন, আবাসস্থাল ও গ্রামীণ অবকাঠামোর নির্মাণের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৮২,০০০ হেক্টর চাষের জমি কমে গেলেও কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন এখন আর অসম্ভব ব্যাপার নয়।

গ্যাট চুক্তির অষ্টম রাউন্ড অর্থাত্‍ উরুগূয়ে রাউন্ডে প্রথমবারের মতো কৃষির অন্তর্ভূক্ত ঘটে। তার মানে এই নয় যে বিশ্ব বাণিজ্যে কৃষিজ পণ্যের বিকিকিনি ঘটেনি। উন্নত দেশসমূহ তাদের অভ্যন্তরীণ কৃষি নীতিকে আড়াল করার চেষ্টা সবসময়ই করছে। কৃষিজাত সামগ্রী বাজারজাত করে তারা বিস্তর মুনাফা কামিয়েছে। শিল্পখাতের আয়কৃত অর্থে আধু-নিকীকরণ করেছে পুরো কৃষি ব্যবস্থা। প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে কৃষিকে বৃহত্‍ বৃহত্‍ খামারে পরিণত করেছে, ফলে উত্‍পাদনও বেড়েছে ঢের। অথচ কৃষিপণ্যের উত্‍পাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে রয়েছে বিশাল ফারাক। শিল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশের ধান উত্‍পাদন খরচের ব্যবধান খুবই বেশি। যদিও অভ্যন্তরীণ ধানের মূল্য তুলনামূলক হারে বেশি কিন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য অবশ্যই অনুন্নত দেশের মূল্যমানের কম। এতে স্পষ্টতই বোঝা যে, শিল্পোন্নত দেশের কৃষি ব্যবস্থা সার্বিকভাবেই ভর্তুকি নির্ভর। এভাবে ভর্তুকি দিয়ে নিজেদের কৃষি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চাইতে উন্নত বিশ্বের বড় যে তাড়ানা ছিল তা হল অনুন্নত বিশ্বের কৃষিকে কোনো না কোনোভাবে ঠেকানো।

আস্কটাডের এক রিপোর্টে দেখা যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় জোট আর জাপান মিলে বছরে কৃষিতে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি প্রদান করে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট OECD ১৯৮৮ সালে একটি হিসাবে দেখায় যে, ১৯৮৪-৮৬ সালের মধ্যে কৃষিতে সবকিছু মিলিয়ে টাকা ফেরত গেছে ১৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাষ্ট্রীয় কোষাগার এই খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছে না বিধায় কৃষিতে গ্যাট-এর অষ্টম রাউন্ডে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় সম্পৃক্ত করে। এখানে AOA চুক্তি সম্পন্ন হয়। এর ফলে যে সমস্ত দেশ কৃষিতে ব্যাপক হারে ভর্তুকি প্রদান করছে তাদের ২০% ভর্তুকি কমিয়ে ফেলতে বলা হয়।

চুক্তিতে বলা হয়, উন্নত দেশগুলো তাদের কৃষিপণ্যের শতকরা ২১ ভাগ ভর্তুকির মাধ্যমে রফতানি করতে পারবে। অনুন্নত দেশ তাদের কৃষিপণ্যের শতকরা ১৪ ভাগ ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে রফতানি করতে পারবে। অকারণে কৃষিতে আমাদের টিকে থাকা দু:সাধ্য হয়ে পড়েছে। (১৯৯৪ সালে) বাংলাদেশে প্রতি টন ধানের উ:পাদন খরচ ১৩৮ ডলার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রয় মূল্য প্রতি টন ১৮০ ডলার। কৃষিত খাতে যদি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হয় তবে উত্‍পাদন খরচ বাড়বে নিশ্চিত, এখনো এ ধরনের প্রভাব কৃষিতে লক্ষণীয়। ফলে প্রান্তিক চাষী, বাংলাদেশের শতকরা ৭০ ভাগ লোক, কৃষিতে উত্‍সাহ  হারাবে। শুরূ হবে কৃষি শিল্পায়ন, একক প্রজাতির শস্যের আবাদ, অধিক ফসলের আশায় বিপুল সার কীটনাশক প্রয়োগ, এমনকি সর্বনাশা হাইব্রিড শস্যের আবাদে বিনষ্ট হবে বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য পারিবারিক কৃষি ব্যবস্থা। বুদ্ধিজাত সম্পত্তি ও প্রাণ বৈচিত্র্যে আধিপত্য ডব্লিউটিও কৌশলে অনুন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ট্রিপস চুক্তি (TRIPS) স্বাক্ষর করে নিয়েছে।

এর অর্থ হল বাণিজ্য সংশ্লিষ।ট বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার। এই চুক্তিতে নতুন যে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে তা হলো বুদ্ধিজাত সম্পত্তি। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের বুদ্ধি বা মেধা খাটিয়ে যদি কোনো নতুন সামগ্রী বা ডিজাইন বা কলাকৌশল আবিস্কার ও সৃষ্টি করে তবে সেগুলো বুদ্ধিজাত সম্পত্তি হিসেবে ধরা হয়। শুধু তাই নয়, জমি ও প্রকৃতির বিভিন্ন উপদানসমূহও মালিকানা, দখলদারিত্ব, অধিকার প্রভৃতি আইন করে বাণিজ্যে সম্পৃক্ত করা হয়েছে ট্রিপস চুক্তির মাধ্যমে।

একটা সময় ছিল যখন বিশ্বাস করা হতো বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক আবিস্কারসমূহ  মানুষের সাধারণ সম্পত্তি, তাতে ছিল আমজন তার অধিকার। বিজ্ঞানীরাও সভ্যতার বিকাশের জন্য মানুষের উপকারের জন্য নিরলস ও নির্লোভভাব কাজ করের গেছেন আজীব। ইতিহাস সেইসব মহত্‍প্রাণকে আজও স্মরণ করে পরম শ্রদ্ধায়। সময় বদলেছে, বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ মুনাফামূখী হয়ে পড়ছে দিনকে দিন। বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিস্কার এখন কর্পোরেট সম্পত্তি। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন বৈজ্ঞানিক নিয়োগ দেয়। আবিস্কার করে নতুন নতুন সামাগ্রী বা ডিজাইন বা কলাকৌশল। যে গুলো ঐ কোম্পানির পণ্য হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে।

প্যাটেন্ট আইনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দেখা যায় যে, এ সমস্ত কার্যকলাপে শুধু উন্নত দেশসমূহই সম্পৃক্ত ছিল। এ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনা, সমঝোতা ও চুক্তি করার ভিন্ন ফোরাম ছিল। এক্ষেত্রে SWorld lntellectual property Organization (WIPO)ছাড়াও জাতিসংঘ ও আষ্কাটাড কথা বলেছে বিভিন্ন সময়। তবুও উন্নত দেশগুলো এ বিষয়টিকে বিশ্ববাণিজ্য চুক্তির আওতায় এনেছে। এর প্রধান কারণ হল, যদি কোনো অনুন্নত দেশ শিল্পোন্নত দেশের কোন কোম্পনির বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার খর্ব করে তাহলে অনায়াসেই শাস্তি দেয়া যাবে। কারণ যেসব দেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে তাদেরকে অবশ্যই এ সম্পর্কিত সব চুক্তি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় এক খাতের পরিবর্তে আরেক খাতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ তো রইলোই।

বাংলাদেশসহ অনুন্নত দেশসমূহ এখনও উদ্ভিদ, গাছগাছড়া, প্রাণী, অনুজীবসহ অন্যান্য প্রাণ বৈচিত্র সমৃদ্ধ। কৃষি এ সমস্ত দেশে তথাকথিত শিল্প হিসেবে বিকশিত না হলেও প্রথাগত ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও অধিকাংশ মানুষের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। প্রাণ সম্পদের ওপর নিজস্ব মালিকানা বা অধিকার বলতে কখনো কিছু ছিল না। তাই কৃষিতে বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার বলবত্‍ থাকার কথা নয়। প্রথম গ্যাট চুক্তির মাধ্যমে কৃষি বাণিজ্যিকিখরণ ও প্রাণ সম্পদের ওপর বুদ্ধিবৃত্তীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হল। ফলে আমাদের কৃষকের নিজের বলে কিছু থাকল না। না বীজ, না কৃষি প্রযুক্তি। অথচ কৃষির সেই সৃষ্টিলগ্ন থেকে কৃষক তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন শস্যের আবাদ, বীজ সংরক্ষণ, নয়া কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ইত্যাদি করে আসছে।

এ অবস্থায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভর চাষাবাদের ফলে একদিকে নিজেদের পরিবেশ এবং প্রাণবৈচিত্র্য যেমন ধ্বংস হচ্ছে তেমনি উচ্চহারে ভর্তুকির ফলে খালি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। গুটিকতস শস্য বা উফশী জাতীয় ধানের চাষাবাদের ফলে খালি ধানের ওপর নজর আবদ্ধ রাখা হচ্ছে। কৃষির আধুনিকায়নের ফলে মাছ ও কুড়িয়ে পাওয়া অন্যান্য খাদ্যের যে সর্বনাশাটা হয়ে গেছে তার হিসাব আমরা করছি না।

ডব্লিউটিও: অনুন্নত দেশের শিল্পায়নে প্রতিবন্ধকতা

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বায়নের চাপে বাংলাদেশে শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা কাঠামোগতভাবে রূদ্ধ হয়েছে। ত্বরান্বিত হয়েছে বিশ্বায়ন এবং পরিপুষ্ট হচ্ছে অনুত্‍পাদনশীল খাত এবং নিকৃষ্ট পুঁজির বিকাশ। গত ৩০ বছরে জাতীয় উত্‍পাদনে শিল্পের অবদান বাড়েনি বললেই চলে, বাড়ছে মাত্র ৮%-১০%। শিল্পখাতের যেসব অংশে অপেক্ষকৃত প্রবৃদ্ধি ঘটেছে সেগুলো আদৌ শিল্পখাত কিনা ভেবে দেখতে হবে। কারণ মৌলিক শিল্প যেমন জয়দেবপুরের মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি অথবা চট্টগ্রামের ইস্পাত কারখানা ও জিএম প্লান্টসহ দেশীয় কাঁচামালনির্ভর শিল্প বন্ধ হচ্ছে। অথচ তৈরি পোশাক শিল্প অথবা প্রযুক্তি হস্তান্তরের নামে গছিয়ে দেয়া পরিবেশ বিপর্যয়কারী শিল্প (উদাহরণস্বরূপ, হঠাত্‍ করে বৃদ্ধি পাওয়াসিমেন্ট শিল্প, ইউরোপে এই শিল্প নিয়ে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার) বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ হালকা, ভাসমান শিল্পখাতসমূহে মুল্য সংযোজন ও সামাজিক উপযোগ অথ্যন্ত কম, যা সুদৃঢ় অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্ত নির্দেশ করে না। শিল্প বিকাশের বিপরীতে দ্রুতগতিতে যা বাড়ছে তা হলো সেবাখাত। যেখানে জমি,-সম্পত্তি ক্রয়, নির্মাণ কাজ, রিয়েল এষ্টেটসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা মিলে এ খাত তৈরি হয়েছে যা জাতীয় উত্‍পাদনে ৫০% অবদান রাখছে। টাকাওয়ালারা উত্‍পাদনশীল শিল্পে বিনিয়োগের পরিবর্তে রিয়েল এষ্টেটের ব্যবসা, নির্মাণকাজ এগুলোতে বেশি বিনিয়োগ করেন।

ফলে উত্‍পাদনশীল কৃষি ও শিল্প দুটি খাত বিকশিত না হয়ে তার স্থলে জায়গা দখল করেছে অনুত্‍পাদনশীল সেবা খাত। তাতে বিকশিত হলো নিকৃষ্ট পুঁজি যেখানে বিনিয়োগ বাড়বে কিন্ত উত্‍পাদনশীল বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যাবে। এর সঙ্গে সম্পর্ক থাকছে বিদেশী সাহায্য নির্ভরতা, কালো টাকার দাপট এবং এসবের সহায়ক রাজনৈতিক কাঠামোর। বাংলাদেশে শিল্পের ইতিহাস পুরনো নয়। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিমত পাকিস্তানের শিল্পজাত পণ্যের সংরক্ষিত বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শোষণ-শাসন। তারপরও তত্‍কালীন পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শিল্পখাতের মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ১৯৭০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্‍ পুঁজির নিয়ন্ত্রণের যে শিল্পখাত গড়ে ওঠে তা তাদের জন্য লাভজনক ছিল। স্বাধীনতার পর তত্‍কালীন শাসকগোষ্ঠী তখনকার রাজনৈতিক প্রয়োজনে জাতীয়করণ কর্মসূচি ঘোষণা করে। জাতীয়করণ করার ফলে ৭টি সংস্থার অধীনে রাষ্ট্র্যায়ত্ত খাতই হয়ে দাড়াঁলো শিল্পের মূলধারা। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের মূলধারা বিভিন্ন কারণে বিকাশ লাভ করেনি। এর পেছনের কারণসমূহ হলো দুর্নীতি, লুটপাট, অদক্ষতা, স্বজনপ্রীতি, প্রয়োজনতিরিক্ত নিয়োগ, শ্রমিক রাজনীতির নামে জবরদস্তি দলীয়করণ। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বেসরকারি খাতকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের নীতি ঘোষিত হয়।

১৯৮০ সালে বাংলাদেশের আইএমএফExtended Fund Facility (EFE) স্বল্পমেয়াদি ঋণ মঞ্জুর করে। এ ঋণের শর্ত হিসেবে আইএমএফ বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন নীতিতে, বৈদেশিক মুদ্রা হারে এবং বৈবেশিক বাণিজ্যনীতিতে অনেকগুলো পরিবর্তনের সুপারিশ করে। সবগুলো নীতি সরকার আইএমফের মর্জিমাফিক করতে না পারায় ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে ৮০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুত ঋণের মধ্যে মাত্র ২০ মিলিয়ন ডলার প্রদানের পর আইএমএফ (EFE) কর্মসূচির আওতায় ঋণ প্রদান স্থগিত ঘোষণা করে।

সাধারণভাবে বলা যায় যে, ১৯৮০-র দশক ও তার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এইড কনসোর্টিয়াম, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ প্রধান অভিবাবকের ভুমিকায় অবর্তীণ হয়েছে। আশির দশকের শেষ দিকে বিশ্বব্যাপী পরম আদর্শিক বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে তথাকথিত বাজার অর্থনীতি প্রবর্তনের প্রেসক্রিপশন হিসেবে উন্নয়ণশীল দেশগুলোর জন্য কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি Structual Adjustment Program (SAP) ঘোষণা করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিকাশকান পরিকল্পিত অর্থনী&#