প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

ক্ষতিপূরণ কমিশন, শিল্প শ্রমিকের স্বপ্ন-একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ


বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা ও প্রচলিত ক্ষতিপূরণ আইন শিল্প খাতে বিশেষভাবে তৈরি পোশাক শিল্পে সংঘটিত দুর্ঘটনাকে কার্যকরভাবে তুলে ধরা এবং এর মাধ্যমে দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি প্রতিস্থাপনে অকার্যকর হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অবদান সংবলিত শিল্প খাত হিসেবে গার্মেন্টস খাতসহ সামগ্রিক শিল্প খাতের শিল্পদুর্ঘটনা  মোকাবেলা এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন যথার্থ নয় বলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই এর সংস্কার এবং যুগোপযোগী আইনের দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের ট্রেড ইউনিয়ন থেকে শূরু করে জাতীয় পর্যায়ের ফেডারেশন, সুশীল সমাজ, বেসরকারি উন্নয়ন উদ্যোগ সবাই উন্নত বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশের ক্ষতিপূরণ আইন সংশোধন ও যুযোপযোগীকরণ এবং ক্ষতিপূরণ কমিশন গঠনের জন্য সরকার থেকে শূর করে নীতিণির্ধারক ও আইন প্রনেতাদের প্রতি জোর দাবি উত্থাপন করে আসছে।

বিদ্যমান ক্ষতিপূরণ আইন কোনোভাবেই যে তৈরি পোশাক শিল্পে সংঘটিত দুর্ঘটনা থেকে শূরু করে অন্যান্য শিল্প খাতের দুর্ঘটনার বাস্তবসম্মত কোনো প্রতিকার বিধানে কার্যকর নয় তা এখন পরিস্কার। সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের জন্য এখনই  জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সমন্বয়ে একটি ক্ষতিপূরণ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমে শিল্প খাতে সংঘটিত দুর্ঘটনাকে বাস্তবসম্মতভাবে মোকাবেলা করতে পারবে বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। শিল্প দুর্ঘটনা প্রতরোধে ক্ষতিপূরণ কমিশনের রূপরেখা কেমন হতে পারে তার একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হলো-

ক্ষতিপূরণ কমিশন কেন প্রয়োজন-

  • ক্ষতিপূরণ কমিশন হবে এমন একটি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ যারা ক্ষতি পূরণ আইনের আওতায় প্রাথমিক ভাবে সকল দায়িত্ব পালন করবেন।

  • কমিশন প্রথম অভিযোগের ভিত্তিতে তাত্‍ক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা অভিযোগকারী শ্রমিকের কাছে বা নিকটস্থ স্থানে পৌঁছে যাবে এবং অভিযোগ বা ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত শুনবেন।

  • তাত্‍ক্ষনিকভাবে শ্রমিকের চিকিত্‍সার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং চিকিত্‍সার ধরন কেমন হবে তা বোঝার চেষ্টা করবেন।

  • যদি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং গুরুতর কোনো অপারেশনের প্রয়োজন হয় তাহলে জরুরিভিত্তিতে সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কেননা, চিকিত্‍সা অবহেলিতজনিত কারণে শ্রমিকের যেন কোনো বাড়তি ক্ষতির স্বীকার হতে না হয়।

  • চিকিত্‍সা বিল প্রদানের ক্ষেত্রে কমিশনই ব্যবস্থা নেবেন।

কমিশনের প্রধান কাজ হবে

  • আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা

  • চিকিত্‍সা সুবিধা নিশ্চিত করা

  • অক্ষমতার ধরন বা প্রকৃত ক্ষতির বিবরণ পেতে চেষ্টা করা

  • পেশাজনিত রোগ-ব্যাধি নিরূপন করা

  • শ্রমিক যারা আহত এবং অসুস্থ হয়েছে যার সঙ্গে তার কাজ সরাসরি জড়িত ছিল তা চিহ্নিত করা

  • বিশেষভাবে গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে যেসব পেশাগত রোগব্যাধি হয় তা নিরূপনের সহায়তা করা

  • ক্ষতিগ্রস্ত বা আহত শ্রমিকের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া

  • সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের জন্য ভুমিকা পালন

  • কর্মক্ষেত্রে শারীরিকভাবে অক্ষম হলে কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত তা নিরূপণ

  • কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটলে তার পোষ্য ও অভিভাবকগণের কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত তা নিরূপন

  • পুর্নবাসনে কী ব্যবস্থা করা হবে তার সুপারিশ

ক্ষতিপূরণ কমিশনের গঠন ও তহবিল সংগ্রহ যেভাবে হতে পারে-

  • কমিশনের তহবিলে সম্পদের যোগান দিতে সরকারকে বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে

  • কমিশনের নিজস্ব জরূরি তহবিল থাকবে, যেখানে প্রতি মাসে শ্রমিক-মালিক সম্মিলিতভাবে চাঁদা প্রদান করে তহবিলকে সমৃদ্ধ করবেন

  • চাঁদা প্রদানের ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিক অনুপাত হবে ৫: ০.৫০

  • নিয়োগকর্তা বাধ্যতামূলকভাবে শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের জন্য বীমা ব্যবস্থা চালু করবেন বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকের আর্থিক সমর্থন দেওয়া সম্ভব,এ বিষয়টিও ক্ষতিপূরণ কমিশন তদারকি করবেন

  • ক্ষতিপূরণ আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণ কমিশনের সমস্যা ও অভিযোগ সমাধানের চিত্র আমরা কল্পনা করতে পারি

ক্ষতিপূরণ কমিশনের রূপরেখা

  • দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ বিরোধ নিরসনমূলক চিত্র
  • বিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির বা সমাধানের উদ্যোগ
  • কমিশনের সদস্য-কর্মচারীকে সমস্যা সম্পর্কে জানাতে হবে, তারা আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের সঙ্গে এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধান করবেন
  • কমিশনের কর্মকর্তাদের উদ্যোগ যদি ব্যর্থ হয় তাহলে কমিশনের বিরোধ পুনর্বিবেচনা কমিটিতে বিষয়টি পাঠাতে হবে
  • পুনর্বিবেচনা কমিটিতে যদি কোন ফলাফল না হয় তাহলে আদালতে প্রতিকারের জন্য মামলা করা হবে

মামলা রূজুর ক্ষেত্রে যে সকল বিষয় বিবেচনা করতে হবে তাহলো: 

  • অভিযোগকারী ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে তার অভিযোগ বিষয়ে অবস্থান তুলে ধরবেন

  • সাক্ষী নিশ্চিত করবেন

  • নিজের অনুকূলে স্বাস্থ্য প্রমাণাদি হাজিরকরা

ইনসিডিন বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করছে।

একটি সমন্বিত শিল্প কাঠামো বিনির্মাণের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষ শ্রমিক তার অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন একটি স্থায়িত্বশীল শিল্পের পূর্বশর্ত।

এ বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসিডিন বাংলাদেশ শ্রমিকের অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে নিরলস কাজের অংশ হিসেবে গার্মেন্টস খাতের ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে পরামর্শ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে প্রচলিত শ্রম ও ক্ষতিপূরণ আইন, গার্মেন্টস শিল্পে সংঘটিত দুর্ঘটনা মোকাবিলায় যথার্থ নয়। প্রয়োজন এ ক্ষতিপূরণ আইনের যুগোপযোগীকরণ এবং আইনের আশু সংস্কার। একমাত্র সংস্কার ও যুগোপযোগ আইন নিশ্চয়তা দিতে পারে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ শিল্পের স্থায়িত্বশীলত, বিকাশ এবং শ্রমিকের সুরক্ষা।

রফিকুল ইসলাম খান