মাহফুজ উল্লাহ
যে কথা বলতে চাই
শুরূতেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভেতরে সদস্যরাষ্ট্রগুলো বিভিন্নভাবে বিভক্ত। এই বিভক্তির কারণ অর্থনৈতিক, আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক। তবে মূলত বিভাজনের ভিত্তি বিভিন্ন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা। এ হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যরাষ্ট্রগুলো তিন ভাগে বিভক্ত- উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত। অবশ্য এর বাইরেও বিভাজন আছে। তবে লড়াইয়ে তিন গ্রুপ তিন অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। এদের মধ্যে আবার দলছুটের প্রবণতাও আছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অর্থনৈতিকভাবে বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভক্তির প্রবণতাও বাড়ছে। অতীতে অর্থনৈতিকভাবে বিভক্ত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে যে ঐক্য বজায় রাখতে পারত, হালে সে অবস্থা বদলে গেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ১০ বছরের হালচালে সদস্যরাষ্ট্রগুলো বর্তমানে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে যত বেশি সোচ্চার, গোষ্ঠীস্বার্থ সম্পর্কে ততটা নয়। এর প্রতিফলন ঘটেছে হংকংয়ে সদ্যসমাপ্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ষষ্ঠ মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে।
সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পর্বে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীরা তাদের জাতীয় স্বার্থের কথা অনেক বেশি বলেছেন। অতীতে এ অবস্থান এতটা স্পষ্ট হয়নি। হংকং বৈঠক শেষে একেকটি রাষ্ট্র চাওয়া ও পাওয়ার একেক রকম হিসাব করছে। কানকুন সম্মেলনের অব্যবহিত পর উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিগত দিনে তাতে ফাটল ধরেছে। যারা বড় গলায় উন্নত বিশ্বের রূখে দাঁড়ানোর কথা বলেছিল সেই ভারত ও ব্রাজিল মূল গোলমালটা বাধিয়েছে।
দোহা সম্মেলন-পরবর্তী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার জন্য বাজারে প্রবেশাধিকার থেকে শুরু করে সহজে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে সহযোগিতা আশ্বাস দেয় অন্যান্য রাষ্ট্র। কিন্তু পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, স্বল্পোন্নত দেশগুলো থেকে রপ্তানি কমছে এবং এসব দেশে আমদানি বাড়ছে। সোজা কথায়, এদের কষ্টার্জিত অর্থ চলে যাচ্ছে অন্য দেশের শিল্প চাঙ্গা রাখার জন্য। ১৯৯০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়ে যেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার, সেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার কোটি ১০০ ডলার। সেবা খাতের ক্ষেত্রেও অবস্থা একই। ২০০৩ সালের বাণিজ্যিক সেবা খাতের পরিমাণ ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ। আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সেবা খাত মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র ৮ ভাগের ১ ভাগ অর্থ আয় করেছে। অপরদিকে এ সময়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বাণিজ্যিক সেবা খাতে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বাজারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পণ্যের প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। একই সঙ্গে অগ্রগতি হলেও বিভিন্ন নামে ও অজুহাতে বেড়েছে অবাণিজ্যিক প্রতিবন্ধক।
দোহা রাউন্ডের 'গরিববান্ধব' কর্মসূচির স্লোগান বলতে এখন বোঝায় আরো বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক এবং শুল্ক হ্রাসে নমনীয়তার অভাব। বাণিজ্য - প্রভুদের বণিকের মানসিকতা বিকৃত করেছে দোহার প্রতিশ্রুতিকে।
এ কারণেই বহু বিতর্কিত কৃষি চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষেও হংকং বৈঠকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এ চুক্তির প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিরোধ থাকলেও উভয়পক্ষই শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের সময়সীমাকে মেনে নিয়েছে, যে তারিখের মধ্যে অবসান ঘটবে সব ধরনের ভর্তুকির। এর কারণ হচ্ছে, ২০০২ সালে জার্মানি ও ফ্রান্স কমন এগ্রিকালচার পলিসি বা অভিন্ন কৃষি নীতামালার (ক্যাপ) অধীনে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ভর্তুকি খাতে ব্যয় না কমানোর ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশও এ অবস্থা মেনে নেয়। ক্যাপের অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বার্ষিক বাজেটের শতকরা ৪০ ভাগ যায় কৃষি খাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শ্রমশক্তির শতকরা ২ ভাগেরও কম কৃষি খাতে জড়িত। ২০০৩ সালের ক্যাপ নীতিমালায় সংশোধনী এনে মূল্য সহায়তার পরিবর্তে ভর্তুকির বিষয়টিকে আয় সহায়তায় পরিণত করা হয়েছে। তবে কৃষি খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভর্তুকির শতকরা ৮০ ভাগ ভোগ করে ২০ ভাগ ধনী কৃষক। এই কৃষকদের অধিকাংশই ফ্রান্সের এবং এদের রাজনৈতিক শক্তিও অনেক। তবে ভর্তুকি আবার ইউরোপীয় কৃষকদের চরিত্র নষ্ট করে দিয়েছে- ক্যাপের অধীনে কৃষক যে ভর্তুকি পায় তা তার কর-পূর্ব আয়ের শতকরা ৯০ ভাগ। এর অর্থ, এই ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হলে সেখানে বহু কৃষক পথে বসবে। এত কিছু করেও তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। ব্রাজিলের গরূর মাংস ও চিনি প্রবেশ করছে ফ্রান্সের বাজারে। প্রতিযোগিতায় ফরাসি কৃষকরা পিছু হটছে, আর তাই বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, বিশেষ করে ফ্রান্সের সরকার কৃষি ভর্তুকি প্রশ্নে নমনীয় ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে অনমনীয় হলেও তার বাজার উন্মক্ত করে দিয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য। এর মূল কারণ, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমদানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ উত্পাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
হংকং বৈঠক আরকেটি বিষয় পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, তা হচ্ছে বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ বা নতুন ভারসাম্য। হংকং বৈঠকের সমাপ্তি অধিবেশনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক প্যাসকেল লামি বলেছেন, ক্ষমতার ভারসাম্য এখন উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে। এর কারণ, কানকুন সম্মেলনে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত ভারত ও ব্রাজিল ইতোমধ্যে দল ত্যাগ করে যোগ দিয়েছে বড় ভাইদের ক্লাবে। বিগত দুই বছরে এরা যে কাজগুলো করেছে তার ফলে হংকং বৈঠক শেষে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত পণ্য রপ্তানির দাবির বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুলার ওপর রপ্তানি ভর্তুকি হ্রাস করার জন্য আরো এক বছর সময় চেয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভেনিজুয়েলা ও কিউবা তফসিল-সির বিরোধিতা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং ন্যাম ১১-এর বিক্ষুব্ধ সদস্যদের ঠেকিয়ে দিয়েছে। ব্রাজিল ও ভারতের বর্তমান সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, বড় ভাইদের সঙ্গে ওঠাবসা করার স্বার্থে সেসব ত্যাগ করেছে। হংকং শিখিয়েছে, বাণিজ্য রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কেউ অন্যের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে চায় না।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, শেষ বিচারে রাজনীতি আন্ত:রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কে নিয়ন্ত্রণ করে। জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার করিডোরে বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় না। এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় হোয়াইট হাউস ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। হংকং সে বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট পোর্টম্যান এ কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রকাশ্যে ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায়। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে তিনি এ কথা জানান দিয়েছেন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময়, আর প্রকাশ্যে বলেছেন বাংলাদেশী ও বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনার সময়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ব্যাখ্য করে তিনি বলেছেন, ১০০ ভাগ শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্যের প্রবেশাধিকারের ব্যাপারে তার পক্ষে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়াকে। কেননা, পোর্টম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক এখন প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে আছে। তাই সুবিধা পেতে হলে ওয়াশিংটনে লবিং করতে হবে। এর আগে সাবেক মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট জোয়েলিকও একই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে।
বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে এমন একটি অবস্থান নেবে তা নতুন কোনো বিষয় নয়। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি জানতেন, তাই এটা বিনা মেঘে বজ্রপাত নয়। এ ব্যাপারে মার্কিনিরা অনেক আগেই তাদের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। বজ্রপাতের আঘাত বাংলাদেশ পেয়েছে পাকিস্তানের কাছ থেকে, যা বাংলাদেশী প্রতিনিধি দল মোটেও আঁচ করতে পারেনি। তবে এবারের বৈঠকে আরো কিছু চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ভেতরেই অনৈক্যের চাপ ছিল স্পষ্ট। বাংলাদেশ তার বিভিন্ন অবস্থানে লেসেথো, উগান্ডা, সেনেগাল, সিরেয়া লিওনের কাছ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের বিরোধিতা করার জন্যই পাকিস্তানকে অকৃষি পণ্যের বাজার অধিকার (NAMA) সম্পর্কিত আলোচনায় সভাপতিত্বের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য আলোচনায় গত ১০ বছরে অনেক গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বাণিজ্য রাজনীতিতে সফল হতে হলে অবশ্যই দরকষাকষির দক্ষতা অর্জন করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দরকষাকষি এতই জটিল এবং বিষয়গুলো এত বিস্তৃত যে, কয়েক ব্যক্তির দক্ষতা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশে এবং জেনেভার বাংলাদেশ মিশনের দক্ষতা বাড়াতে হলে কর্মী ও কূটনীতিকের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যা নি:সন্দেহে ব্যয়বহুল। অর্থমন্ত্রী এ ব্যয় বৃদ্ধিতে রাজি হবেন না- সংশ্লিষ্টরা এমন অভিযোগ করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একমসয় মনে করা হতো, বাণিজ্য উদারীকরণ ও মুক্ত বাণিজ্যের ফলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তার গুরুত্ব হারাতে বসেছে। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। এখন বাণিজ্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এবং প্রায়শ জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য জেনেভায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসকে প্রায় সারা বছর ব্যস্ত থাকতে হয়। বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়। ওই কারণে বাংলাদেশের দূতাবাসের অনেক ক্ষুদ্র কর্মচারীকেও অনেক সময় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বৈঠকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়।
বাণিজ্য রাজনীতিতে দক্ষতা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, উপলদ্ধি যে কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল এবার সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে। হংকং বৈঠকের এটিও একটি শিক্ষা।
সুত্র: আমার দেশ
লেখক সাংবাদিক ও কলাম লেখক।