প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

হংকংয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি শূন্য


জাহাঙ্গীর কাজল

তবে সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি

হংকংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সম্মেলন থেকে দৃশ্যত বাংলাদেশ কিছুই পায়নি। এবারের সম্মেলন শুরূর আগে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ শত ভাগ পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা আদায়ের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু দরকষাকষির পর উন্নত দেশগুলো তাদের বাজারে স্বল্পোন্নত দেশের শত ভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে রাজি হয়নি। ২০০৮ সাল থেকে উন্নত দেশগুলো কমপক্ষে ৯৭ শতাংশ পন্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেবে। তবে বাকি তিন ভাগ পণ্যের ওপর প্রচলিত হারে শুল্ক দিয়ে উন্নত দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে স্বল্পোন্নত দেশের পণ্য। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলো নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী তাদের ট্যারিফ লাইনের ৩ শতাংশ পণ্যের তালিকা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ রপ্তানি খাত বস্ত্রশিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় (৭৫ শতাংশ) এখন থেকে ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হংকং ঘোষণার পর বাংলাদেশের উচিত উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে সেসব দেশের সেনসেটিভ লিস্ট  থেকে বস্ত্র খাতের পন্য বাদ দেওয়ার ব্যাপারে জোর লবিং করা।

হংকং সম্মেলনে বাংলাদেশের ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশী প্রতিনিধি দলের দরকষাকষির দক্ষতার অভাবকে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবও অনেকাংশে দায়ী।

হংকং ঘোষণার পর বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এতে ডব্লিউটিওর মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার আশা ধুলিসাত্‍ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট ট্যারিফ লাইন ১১ হাজার ৩১২টি, ৩ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা না দেওয়া হলে মোট ৩৩৪টি ট্যারিফ লাইনে শুল্ক প্রদান করা বাধ্যতামূলক হবে। যেহেতু উন্নত দেশগুলো নিজেদের মতো করে শুল্কমুক্ত ৩ শতাংশ পণ্য নির্ধারণ করবে, তাই অনেক দেশেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তৈরি পোশাক তাদের সেনসেটিভ লিস্টে রাখবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া জাপান চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং চাল শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে না। তবে জাপান ৯৮ দশমিক ৬ ভাগ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে, পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলো উন্নত দেশের সেনসেটিভ লিষ্টে ঢুকে যাবে। হংকং ঘোষণা অনুযায়ী ২০০৬ সালের জুলাই মাসের মধ্যে উন্নত দেশগুলো তাদের সেনসেটিভ লিস্ট তৈরি করবে। তাই এর মধ্যেই বাংলাদেশকে তার রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগাতে হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের সেনসেটিভ লিষ্টে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যকে অন্তভূর্ক্ত না করে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের বড় বাজার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যে স্বল্পোন্নত দেশকে শত ভাগ শুল্কমুক্ত দেবে না তা বাংলাদেশ আগে থেকেই জানত। ২৬ নভেম্বর জেনেভা থেকে হংকং ঘোষণার প্রথম খসড়া তৈরি হয়েছিল তাতে শত ভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল না। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ছিল ৯৫ ভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের মনোভাবের পরও বৃহত্তম রপ্তানি খাতকে বাঁচাতে বাংলাদেশ সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের দেনদরবারের চেষ্টা করেনি।

এদিকে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের দরকষাকষির দক্ষতা তৈরি না হওয়ায় এই সম্মেলন থেকে দৃশ্যত কিছু পাওয়া যায়নি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের জন্য টেকনিক্যাল ব্যর্থতা নয়, রাজনৈতিক ব্যর্থতাই দায়ী। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় ফ্যক্টর এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ লবিং করা উচিত ছিল। দোহা রাউন্ডে কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল, এখানে তাও নেই। তাই হংকং ঘোষণা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য রপ্তানিতে উত্‍সাহিত হতে হবে। এ ছাড়া আলোচনা দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ডব্লিউটিও সদর দপ্তরে জনবল বাড়াতে হবে। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনিসুল হক বলেন, ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি এতে উপকৃত হবে না। এখন ট্রেড অ্যাক্ট বিল পাস করানো ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধায় তৈরি পোশাক রপ্তানি বিকল্প রইল না।

হংকং সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে সুতা আমদানি করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই প্রতিনিধি দলে থাকা বিটিএমএ চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল সম্মেলন মাঝপথে রেখেই দেশে ফিরে আসেন। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনিসুল হক সম্মেলন শুরূর তিন দিন পর যোগ দেন। এতে প্রতিনিধি দলের মধ্যে নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে সমন্বয়হীনতা ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো স্বার্থরক্ষায় তাদের মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে। ভারতীয় বাণিজ্যমন্ত্রী কমলনাথ প্রায় প্রতিদিনই ভারতীয় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশী সাংবাদিকদের জন্য ছয় দিনে মাত্র একবার বিফ্রিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। সম্মেলনের চতুর্থ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ট্রেড অফিস বাংলাদেশী সাংবাদিকদের উদ্দেশে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদর অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাক নিয়ে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ। এর অর্থ হলো এই খাতে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন। বিষয়টিকে বাণিজ্যমন্ত্রী চতুর্থ দিনের সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করেন । ফলে সুবিধা পাওয়ার আশা শেষ হয়ে যায়।

এদিকে, হংকং ঘোষণার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ট দরিদ্র মানুষের জীবন মানের উন্নয়নের কোনো ইতিবাচক কথা নেই। সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে সংবাদ সম্মেলনের ডব্লিউটিও মহাপরিচালক প্যাসকেল ল্যামি বলেছেন, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দোহা এজেন্ডার ৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। ইতিপূর্বে গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দোহা এজেন্ডার ৫৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। হংকং বৈঠক শেষে দোহা এজেন্ডার মোট ৬০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। আগামী এক বছরের বাকি ৪০ শতাংশ পূরণ হয়ে যাবে। তবে বিশ্লেষকরা ল্যামির এই বক্তব্য মানতে রাজি নন।  তারা বলেছেন, হংকং ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য উন্নত দেশের বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ছাড়া গরিব দেশগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারের পথও খুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ উন্নত দেশের একক আধিপত্য খর্ব করে স্বল্পোন্নত দেশের অংশীদারিত্ব বাড়ানোই দোহা এজেন্ডার মূল উদ্দেশ্য ছিল।

এদিকে হংকং ঘোষণার কৃষি খাতে ২০১৩ সাল থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের সমন্বিত কৃষিনীতির মাধ্যমে ২০১৪ সালের মধ্যে ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা বললে আলোচনার অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ সময় ভারত ও ব্রাজিল ২০১৪ সালের মধ্যে কৃষি খাতে সব ধরনের ভর্তুকি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়। পরে সব পক্ষ এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে। কৃষি খাত সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ডেপুটি) পিটার আলগোর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, হংকং সম্মেলনের বড় সাফল্য হলো কৃষি খাতের ভর্তুকি সম্পর্কে সবার ঐকমত্যে পৌঁছা।

কৃষি খাতে উন্নত দেশগুলো ভর্তুকি প্রত্যাহার না করায় স্বল্পোন্নত দেশের দারিদ্র বিমোচনকে দীর্ঘস্থায়ী করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো কৃষি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে কৃষি পণ্য মূল্য কমিয়ে রাখে। এতে দারিদ্র দেশের কৃষি পণ্য বাজারে টিকতে না পেয়ে পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে উন্নত দেশ কৃষি ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করেছে ২৭৫ বিলিয়ন ডলার। ১৯৯৯ সালে এই ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২৬ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপের ধনী দেশগুলোর প্রতিটি গরূর বিপরীতে প্রতিদিন কৃষককে ২ ডলার ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। হংকং সম্মেলনে উন্নত দেশগুলোর কৃষিশিল্প ও সেবা খাত আরো উদারীকরণের জন্য স্বল্পোন্নত তথা গরিব দেশগুলো ওপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু এসব দেশকে একটি শক্ত অর্থনৈতিকা ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এ ধরনের চাপ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধিরা।

লেখক: সাংবাদিক