কয়েক একর জায়গা নিয় তৈরি সাততলা সুরম্য ভবন। ঝকঝকে তকতকে ভবনটিতে ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়বে বেশ কয়েকটি কক্ষ। এসব কক্ষে রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিশুদের দেখাশোনার জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার ও লেখাপড়ার ঘর। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এটি বাংলাদেশেরই একটি তৈরি পোশাক কারখানা। ঢাকার অদূরে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকায় এ মানের কারখানা বিদেশী ক্রেতারা ঘুরে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যান। আর শিল্পমালিকরা পান প্রচুর রপ্তানি আদেশ। কারখানার পরিবেশ নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা এখন অনেক বেশি সোচ্চার। তারা রপ্তানি আদেশ দেওয়ার আগে কারখানায় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। আর তাদের সন্তুষ্টির জন্যই প্রদর্শনী কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে এ ধরনের বেশ কিছু পোশাক শিল্পকারখানা।
কিন্তু দেশের অধিকাংশ তৈরি পোশাক কারখানার চেহারা বা মান এমন নয়। বেশির ভাগেরই নেই কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ। বসবাসের জন্য তৈরি বাসাবাড়িতে এসব কারখানা তৈরি হয়েছে, যেখানে অল্প জায়গায় কাজ করেন শত শত শ্রমিক। উঁচু ভবনে ওঠানামার সিঁড়ি অপ্রশস্ত। জরুরি প্রয়োজনে কারখানা থেকে বেরোনোর বিকল্প সিঁড়ি নেই। যাদের আছে সেগুলোও যেন তৈরি হয়েছে কেবল শর্ত পূরণের জন্য, ব্যবহারের উপযোগী নয়। এসব কারখানায় প্রতিদিন শ্রমিকরা কাজ করে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে। মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটে। আর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বের হওয়ার দরজায় থাকে তালা। আগুনে পুড়ে বা পায়ের নিচে পিষে মারা যায় নারী-পুরূষ শ্রমিক নির্বিশেষে। এসব কারখানায় বেশির ভাগেরই ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই। অন্য কারখানার হয়ে (সাব কণ্ট্রাক্ট) পোশাক তৈরি করে তারা।
সাভারের যে সুরম্য ভবনে বর্ণনা ওপরে রয়েছে, সেখানে ওই শিল্প গোষ্ঠীর আটটির মধ্যে চারটি কারখানা অবস্থিত। বাকিগুলোর চেহারা ভিন্ন। সেগুলো ঢাকার মালিবাগ, রামপুরা এলাকায় ভাড়া করা ভবনে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে পোশাক তৈরি হলেও বিদেশী ক্রেতাদের দেখানো হয় সাভার-গাজীপুরের কারখানা। একই রকম ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রমের পুড়ে যাওয় কেটিএস গার্মেন্টসের মালিক ওয়াহিদুল ইসলাম চৌধুরীর ক্ষেত্রে। তার মালিকানায় এরিনা গার্মেন্টস পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থার সদস্য হতে হলে কারখানা ও শ্রমবিধির বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এরিনার সেটা আছে, কিন্তু কেটিএসের নেই।
প্রথম আলোর গত এক মাসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্রেতাদের চাহিদামতো কারখানার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের বড় বড় তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা তাদের কয়েকটি ইউনিটকে এভাবেই আধুনিক সাজে তৈরি করে রেখেছেন। ক্রেতা বা তাদের প্রতিনিধিদের এগুলোতে পরিদর্শন করানো হয়। আর কাজ পেলে ভাগ করে নেয় সব কারখানা। বলার অপেক্ষা রাখা না, ঢাকায় অবস্থিত নিন্মমানের কারখানাগুলো থেকে মুনাফা হয় বেশি। বড় বড় পোশাক শিল্পগোষ্ঠীগুলো বেশি রপ্তানি আদেশ পেলে নিন্মমানের কারখানায় সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়। আর এই সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ করা কারখানাগুলো অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
অনুসন্ধানে পাওয়া এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত করেননি বিজিএমইএ সভাপতি টিপু মুনশী। তিনি বলেন, এমন কয়েকটি বড় গোষ্ঠী থাকতেই পারে। তবে রাতারাতি সব কারখানা উন্নত করা সম্ভব নয়। অনেক দিন ধরে যে কারখানাটি এক জায়গায় চলছে তাও বন্ধ করে অন্যত্র নেওয়া কষ্টকর। ফলে আপনার অনুসন্ধানের কিছু সত্যতা থাকতে পারে।
বিশ্বের নামীদামি ক্রেতাদের সন্তুটি অর্জনের মতো এ রকম পোশাক কারখানার সংখ্যা দেশে খুব বেশি নয়। বিজিএমইএর সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক মানের এমন কারখানা ওভেন খাতে ৬০-৭০টি। তার থেকে একটু কম মানের শ' তিনেক। বিকেএমই সূত্রের হিসাবে নিট খাতের ১ হাজার ২০০ কারখানার মধ্যে গোটা পঞ্চাশেক আন্তর্জাতিক মানের, মধ্যম গোছের কারখানার সংখ্যা আরো শ খানেক।
আর সরকারের শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে ৪ হাজার ৭০০ পোশাক কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৫০০ এখন বন্ধ। বাকিগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ কারখানা মন্ত্রণালয়ের ভাষায় ন্যূনতম মান বা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড পর্যায়ে রয়েছে। বাকিগুলো অর্থাত্ ১ হাজার ৫০০ কারখানার পরিবেশ কোনোভাবেই ক্রেতাদের শর্ত অনুসারে মানসম্মত নয়। অর্থাত্ চালু কারখানাগুলোর মধ্যে প্রায় ৪৭ ভাগ কারখানার কোনো মান নেই, নেই কোনো কাজের পরিবেশ। এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়শই এসব কারখানায় আগুন লাগে। গত ১৫ বছরে এমনই আগুনে পুড়ে, পায়ের নিচে চাপা পড়ে এবং ভবন ধসে মারা গেছে পাঁচ শতাধিক পোশাক শিল্পশ্রমিক, যাদের সিংহ ভাগই নারী। আর নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থার বালাই নেই।
সরেজমিনে ঘুরে এ রকম অংসখ্য কারখানা পাওয়া যায় ঢাকাতেই। মোহাম্মদপুর ট্রাকস্ট্যান্ড লাগোয়া সুপার মার্কেট ভবনে দোতলা থেকে ছয়তলার চারটি পোশাক শিল্প কারখানা রয়েছে। দোতলায় ওয়ার্ল্ড ভিকটরি, তিনতলায় একই মালিকের এজিএম অ্যাপারেল, চারতলায় ফ্যাশন আর পাঁচ ও ছয়তলায় ট্রেড সোয়েটার ও নিট কারখানা। মধ্য এপ্রিলের এক শনিবার বেলা ২টায় কারখানায় বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরে আসা শ্রমিকরা কারখানার ফটক দিয়ে প্রবেশ করা মাত্রই তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। একটি কারখানার মূল ফটকে দুটি কলাপসিবল গেট ও একটি সার্টার। এই প্রতিবেদকের সামনেই সার্টার ও কলাপসিবল গেট টেনে প্রত্যেকটিতেই তালা মেরে দেওয়া হয়। বাকিগুলোয় একটি করে কলাপসিবল গেট ও একটি সার্টার রয়েছে। সেগুলোও একই কায়দায় তালা মারা হয়। একই সঙ্গে সিঁড়ির বাতিগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। ভবনের আরেক পাশের গেট দিয়ে কারখানায় ঢুকে দেখা যায়, গুদামের মতো ঘরে একসঙ্গে কাজ করছে শত শত শ্রমিক। মার্কেট হওয়ায় দুই পাশে সিঁড়ি আছে বটে, কিন্তু তার মধ্যেও এজিএম অ্যাপারেল এক পাশের সিঁড়ির গেট কোনো দিন খুলেছে কি না সন্দেহ। তালায় মরচে পড়ে আছে। ট্রেড সোয়াটারের নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারূল হক অবশ্য গেটে তালা মারা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন এবং এর বিরুদ্ধে লেখার অনুরোধও জানান।
এরচেয়েও অনেক খারাপ অবস্থা মালিবাগ থেকে রামপুর রোডের অধিকাংশ কারখানার। এখানে ক্যামেলিয়া অ্যাপারেলসের সিঁড়ি দিয়ে দুজন মানুষ কোনোমতে পাশাপাশি হাঁটতে পারে। এ সিঁড়ি বেয়ে কারখানায় উঠে দেখা গেল, ঘিঞ্জি পরিবেশে প্রায় ৩০০ শ্রমিক সেখানে কাজ করছে। কারখানার জরুরি নির্গমন সিঁড়ি শেষ হয়েছে ভবনটির গাড়ি বারান্দার ছাদে।
মিরপুর ১ নম্বর অনের্ট গার্মেন্টসের জরুরি প্রয়োজনে বেরোনোর সিঁড়ি দেখে ভয়ই লাগে। সাধারণ সময়ও যে কারো পক্ষে এ পথে নামা প্রায় অসম্ভব। আর আগুন লাগলে এই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলে নির্ঘাত্ বড় আরেক দুর্ঘটনা ঘটবে। লোহার তৈরি বড়জোর ২ ফুট চওড়া এ সিঁড়ি নিচে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে থেকেও বেরোনোর কোনো পথ নেই। আশপাশের ভবনগুলোর উঁচু দেয়াল সে পথ আটকে দিয়েছে। এ সিঁড়ি থাকলেই বা কী আসে যায় এমন প্রশ্নের জবাব দেননি কারখানার কর্মকর্তারা।
মিরপুর ১ নাম্বার থেকে চিড়িয়াখানার দিকে যেতে গোলচত্বরের ডানে একটি ভবনে হায়দারি টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টসের ছয়, সাত ও আটতলায় গিয়ে দেখা যায়, দেড় হাত চওড়া একটি লোহার সিঁড়ি কারখানার সামনে দিয়ে ঝুলে আছে। ভেতরে গিয়ে প্রতিটি তলাতেই এই জরুরি নির্গমন সিঁড়ির গেটে তালা ঝুলতে দেখা যায়। আবার সাত তলার সিঁড়ির দরজার সামনে মেশিনপত্র স্তুপ আকারে ফেলে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে জরুরি সিঁড়িটি কোনো কাজেই লাগবে না।
রামপুরা রোডের উইলস গার্মেন্টসের ভবনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কারখানার প্রধান ফটকের সামনে মালামালের কার্টন স্তুপ করে রাখা হয়েছে। এ কারখানার নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএকে সদস্যপদ দেয়নি। কারণ, এটি ন্যূনতম মানসম্পন্ন ছিল না। জানা গেছে, সদস্যপদ পেতে আবেদন করলেও চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র দিতে না পারায় তাদের সদস্যপদ দেওয়া হয়নি্। তারপরও শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে ওই প্রতিষ্ঠান ব্যবসা চালিয়ে গেছে এত দিন।
বিজিএমইএর সভাপতি টিপু মুনশী জানান, তারা তিন মাসের জন্য তাদের সাময়িক সদস্যপদ দিয়েছিল, প্রয়োজনীয় শর্ত পালন সাপেক্ষে সদস্য পদ দেওয়া হতো। দুর্ঘটনার পর এই সাময়িক সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।
বিজিএমইএ অবশ্য এখন সব কিছুতেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পায়। আগুন লাগা কিংবা ভবন ধসে পড়ার ঘটনা ঘটলে একে নিছকই দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে চায় গার্মেন্টসের মালিকরা। এমনকি ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসে পড়লে এ সংবাদ ফলাও করে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া ঠিক হয়নি বলে মনে করেন অনেক মালিক। একাধিক সভা-সেমিনারে তারা দেশের স্বার্থে এসব খবর কম প্রচার করা উচিত বলেও বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেন।
প্রায় ১০ মাস আগে সাভার পোশাক শিল্প কারখানা স্পেকট্রাম ধসে পড়ার পর বাংলাদেশ বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বিরূপ প্রচারণার মুখে পড়ে যায়। বাংলাদেশের কারখানার পরিবেশ নিয়ে এসব প্রচারণায় বিপাকে পড়ে এই খাত। এক শিল্পমালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সে সময়ের একটি ই-মেইল বার্তা এগিয়ে দেন এই প্রতিবেদককে। ইউরোপের একটি মাঝারি ধরনের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এ মেইলটি পাঠিয়েছেন নিট পোশাকের ওই মালিককে। মেইলে ক্রেতা
লিখেছেন, তোমাদের দেশে আসলে কী হচ্ছে, বলবে? আমরা তোমাদের অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের বিশ্বাস করি না।
বিকেএমইএ সভাপতি ফজলুল হক জানান, ঢাকার ফিনিক্স টেক্সটাইলের ভবন ধসে পড়ার পর বিকেলেই বিশ্বখ্যাত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কটন গ্রুপের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বেলজিয়াম থেকে তাকে মোবাইলে এসএমএস করে দুর্ঘটনা সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছেন।
এক বছরের মধ্যে দুটি ঘটনার পর এ ধরনের এসএমএস ও ই-মেইলের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে নিশ্চিত মনে করেন ফজলুল হক। কিন্তু তার পরও ভবিষ্যতে আর কোনো ঘটনা ঘটবেনা এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না পোশাক শিল্প মালিকরা।
সূত্র: মনজুর আহমেদ,
প্রথম আলো