প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

শ্রমিকের অধিকার জিম্মি

 

বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানায় প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৯০ সালে। সে বছর ডিসেম্বর মাসে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে সারাকা গার্মেন্টস অগ্নিকাণ্ডে ৩২ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সেই থেকে দেশে গত দেড় দশকে প্রায় ৩৬টি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসে অর্ধসহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার আর পঙ্গুত্ববরণ করে অন্যের বোঝা হয়ে মৃত্যুর প্রহর গূনছে অগণিত শ্রমিক। আর এসব দুর্ঘটনার পর বহু শ্রমিক নিখোঁজ ছিল যাদের বেশির ভাগই মরেও মরার স্বীকৃতি পায়নি। নানা বিপর্যয়ে চুপসে যাওয়া এ জাতির বিবেক এসব দুর্ঘটনার পর কিছুটা নাড়া দিলেও কিছু দিন যেতেই সবাই আবার ভুলে যায়। টাকার জোরে মালিকরা কিছুসংখ্যক শ্রমিককে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়মুক্ত হতে পেরেছেন। কিন্তু কেউ খোঁজ নেয়নি নিহত শ্রমিকেরা নাবালক ছেলেটি খেতে না পেয়ে পকেট মারছে কি না, মেয়েটি ক্ষুধার জ্বালায় দেহ বিক্রিতে বাধ্য হলো কিনা। লোক দেখানো কিছু টাকা দিলেই কি মৃত্যুকুপে শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হয়ে গেল? আইন অমাণ্য করা ও শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়ার অপরাধ কি কারো শাস্তি হবে না? কেন গত ১৬ বছরেও এসব ঘটনার কারো শাস্তি হলো না?

দেশের বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ও ভবন ধসে শ্রমিক মৃত্যুর কারণে সাম্প্রতিককালে সরব হয়ে উঠেছিল সারা দেশ। ১৯৯০ সালের সারাকা গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৩২ জন শ্রমিকের কথা বাদ দিলেও হাল আমলের চট্টগ্রামের কেটিএস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ও ঢাকার তেজগাঁওয়ে ফিনিক্স কারখানার ভবন ধসে ২২ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা কয়েকদিন আগের। অথচ এগুলোও মানুষ ভুলে যেতে শুরু করেছে। চাপা পড়ে যাচ্ছে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির বিষয়টি। একাধিক মামলাও হয়েছে, কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হবে কি? গত ১৬ বছরে প্রায় ৩৬টি কারখানায় দুর্ঘটনায় শ্রমিক মৃত্যুর দায়ে দোষী কারো যেহেতু শাস্তি হয়নি, সেহেতু এ ক্ষেত্রেও আদৌ শাস্তি হবে কিনা, শ্রমিকরা ন্যায়বিচার পাবে কি না প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

একের পর এক দুর্ঘটনায় শ্রমিক মরছে, আহত হচ্ছে, দেশের মিডিয়াগুলো ফলাও করে প্রচার করছে, লোক দেখানো কিছু টাকা দিয়ে মালিকরা পার পেয়ে যাচ্ছেন, দেশবাসী ভুলেও যাচ্ছে, তাহলে সবকিছুই কি নিয়ন্ত্রণ করছে মালিকদের টাকা? না হলে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে কেন আন্দোলন তিব্র হচ্ছে না, রাজনৈতিক দলগুলো কেন সরকারকে দোষীদের বিচারের জন্য আলটিমেটাম (যা তারা হরহামেশাই অনেক তুচ্ছ বিষয়েই করে থাকে) দিচ্ছে না?

বাংলাদেশে প্রচলিত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ আইন ১৯২৩-এর বিধানানুসারে দুর্ঘটনায় একজন শ্রমিকের মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ বাবদ সর্বনিন্ম ৮ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২১ হাজার টাকা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে। আর দুর্ঘটনায় স্থায়ী সামগ্রিক অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ বাবদ সর্বনিন্ম ১০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা প্রদানের বিধান রয়েছে। কি হাস্যকর এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ! দেশে বর্তমান বাজারে গরূর মাংসের কেজি প্রতি মূল্য প্রায় ১৫০ টাকা। সে হিসেবে একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য ৫৩ থেকে ১৪০ কেজি গরূর মাংসের মূল্যের সমান। অথচ একটি স্বাস্থ্যবান গরূতে মাংস হয় ২০০ থেকে ৩০০ কেজি। সুতরাং একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য একটি গরূউ মূল্যেরও সমান নয় (?)!

সরকার অতি গোপনে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের খসড়া করেছে। দু:খের বিষয়, তাতেও একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্যকে একটি গরূর মূল্যের চেয়ে মূল্যবান ভাবা হয়নি।

২৪ বছরের যুবক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার কাজী হারূন আল রশিদ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স ভাবন ধরে চাকরিতে যোগদানের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় মারা গেছেন। সেই সঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে তার ও তার পরিবারের সব স্বপ্ন। তার বাবা কাজী মো: ইউসুফ গত ২৪ এপ্রিল সিএমএম জালাল আহমেদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ আদালতের বেঁধে দেওয়া ৩ লাখ টাকার চেক পেয়েছেন। নিহতের বাবা তিলে তিলে গড়ে তোলা উচ্চ শিক্ষিত ছেলের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ নিতে গিয়ে সিএমএম আদালদতে কাঁদলেন, কাঁদালেন উপস্থিত অনেককেই।

প্রশ্ন জাগে মনে, ৩ লাখ টাকার চেক কি সন্তানহারা এই পিতার ক্ষতিপূরণে সমর্থ হবে? তার মন কি বলছে না যে, যারা তার ছেলেকে জেনেশুনে আইনবহির্ভুতভাবে তৈরি কারখানার মৃত্যুভবনে চাকরি করতে দিল তার শাস্তি হোক? ইউসুফ সাহেবের নিশ্চয়ই তার ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে কম করে হলেও ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের ৩ লাখ টাকাই কি তার জন্য যথেষ্ট?

অথচ ১৮৫৫ সালের (১৯৫৫ সালে সংশোধিত) মারাত্মক দূর্ঘটনা আইনে শ্রমিকের মৃত্যুর ফলে তার পরিবারের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, এর সঙ্গে আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের বিধান রয়েছে। আইনের এ বিধানটি মানা হচ্ছে না। আদালতও এটি বলবতের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। এই আইনি বিধান থাকার পরও আদালত কীভাবে ফিনিক্স ভবনে নিহত শ্রমিকের জীবনের মুল্য ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দিলেন? অথচ মারাত্মক আইনের বিধানানুসারে একজন শ্রমিকের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে হলে তা করতে হতো ওই শ্রমিক তার চাকরি জীবনে যত আয় করত তার আনুপাতিক হারে।

নিহত ইঞ্জিনিয়ার কাজী হারূন আল রশিদ দেশের গড় আয়ুর হিসেবে আরো প্রায় ৩৬ বছর চাকরি করতেন। তার মাসিক বেতন যদি গড়ে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকাও ধরা হয়, তাহলে তিনি ৩৬ বছরে আয় করতেন ৪৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর যে শ্রমিকের বেতন ৪ হাজার টাকা সেও হয়তো বাদবাকি জীবনে ১২-১৪লাখটাকাউপার্জনকরত।

তাই আইনের বিধানানুসারে শ্রমিকের পরিবারের আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হলেও ৩ লাখ টাকা কোনোক্রমেই কি যুক্তিযুক্ত বা যথেষ্ট বিবেচিত হতে পারে? বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিদের সংগঠন  বিজিএমইএ আইনের বিধান না মেনে শ্রমিকের জীবনের ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সে হিসেবেই গত বছরের ১০ এপ্রিল সাভারে স্পেক্ট্রাম কারখানার ভবন ধসে নিহত ৬২ জন শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ বাবদ বিজিএমইএ প্রত্যেক নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দিয়েছে। একই ধরনের ক্ষতিপূরণ প্রদানের পাঁয়তারা চলছে চট্টগ্রামের কেটিএস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও যুক্তরাজ্যের উচ্চ আদালতের দুটি পৃথক রায়ে বলা হয়েছে, নিহত শ্রমিক যত দিন কর্মক্ষম থাকতেন, তত দিনের উপার্জনের সমান ক্ষতিপূরণ তার পরিবার পাবে। বাংলাদেশের আদালত এখন পর্যন্ত এ ধরনের রায় দেননি। বাংলাদেশের আদালত কি পারেন না এসব দুর্ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় ইতিহাস সৃষ্টিকারী রায় দিতে?

টাকার প্রভাবে এসব ঘটনার জন্য দায়ি ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু টাকা দিয়ে দুর্ণীতি ও আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যাচ্ছেন। কারখানার মালিকদের শাস্তি হয়েছে এমন নজির আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত স্থাপিত হয়নি। হাল আমলের আলোচিত স্পেক্ট্রাম কারখানার মালিক শাহরিয়ার সহিদ হোসেনের বিরূদ্ধে আইন না মেনে ভবন তৈরির ও গাফিলতির মাধ্যমে শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়ার চাক্ষুষ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এখনো মামলার তদন্ত রিপোর্ট পেশ করা হয়নি। কেটিএস কারখানার মালিকের বিরূদ্ধে দায়ের করা মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি বহু চেষ্টা করেও জানা যায়নি। ধসে পড়া ফিনিক্স ভবনের মালিক দীন মোহাম্মদ লোক দেখানো ক্ষতিপুরণ দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শ্রমিক মারা এসব কারখানার মালিকরা জামিন নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কারণ, তাদের বিরূদ্ধে যে ধারায় মামলা করা হয়েছে তা জামিনযোগ্য আর শাস্তি হলেও তা হবে অতি নগন্য। এদের বিরূদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আইনের আরো কঠোর ও জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করা হয়নি। এত বড় অপরাধ করেও তারা তাদের টাকার জোরে আইনকে ভিন্নপথে পরিচালিত করে নিজেদের রক্ষা করতে পারছেন।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানায় প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৯০ সালে। সে বছর ডিসেম্বর মাসে মিরুপর ১০ নম্বর সেকশনে সারাকা গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে ৩২ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সেই থেকে দেশে গত দেড় দশকে প্রায় ৩৬টি কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসে অর্ধসহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে কায়েক হাজার আর পঙ্গুত্ববরণ করে অন্যের বোঝা হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে অগণিত শ্রমিক। আর এসব দুর্ঘটনার পর বহু শ্রমিক নিখোঁজ ছিল, যাদের বেশির ভাগই মরেও মরার স্বীকৃতি পায়নি। নানা বিপর্যয়ে চুপসে যাওয়া এ জাতীয় বিবেক এসব দুর্ঘটনার পর কিছুটা নাড়া দিলেও কিছু দিন যেতেই সবাই আবার ভুলে যায়। টাকার জোরে মালিকরা কিছুসংখ্যক শ্রমিককে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়মুক্ত হতে পেরেছেন। কিন্তু কেউ খোঁজ নেয়নি নিহত শ্রমিকের নাবালক ছেলেটি খেতে না পেয়ে পকেট মারছে কি না, মেয়েটি ক্ষুধার জ্বালায় দেহ বিক্রিতে বাধা হলো কিনা। লোক দেখানো কিছু টাকা দিলেই মৃত্যুকুপে শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষতিপুরণ হয়ে গেল?আইন অমান্য করা ও শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়ার অপরাধে কি কারো শাস্তি হবে না? কেন গত ১৬ বছরেও এসব ঘটনায় কারো শাস্তি হলো না?

গত দেড় দশকে দুর্ঘটনায় বহু শ্রমিক নিহত হওয়া অন্য অনেক কারখানার মালিকদের মতো এরাও হয়তো ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি ভোগ করবে না। কাল কিংবা সাদা, যাই হোক না কেন, টাকাই কি তাদের নিরাপত্তা বর্ম? শ্রমিক অধিকার হরণকারীদের কাছ থেকে শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে এবং দেশ ও আইন ব্যবস্থাকে টাকার প্রভাবমুক্ত করতে আমাদের শ্রমিকদেরও কি ১৮৮৬ সালের শিকাগো শহরের শ্রমিকদের মতো আরেকবার রাজপথ রক্তে লাল করতে হবে?

এ ব্যাপারে এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মালিকপক্ষ, সর্বোপরি সরকার। তারা কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত না দিলে হয়তো আজীবন শোষিত এ শ্রমিক শ্রেণী তাদের পূর্বসুরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অচিরেই কারখানা ছেড়ে রাজপথে নেমে আসবে। তাই সময় থাকতেই ন্যায় বিচার কায়েম করূন,শ্রমিকের অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করূন।