প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

মজুরি তত্ত্ব ও ন্যূনতম মজুরি

 

সামন্তবাদীয় ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাওয়ার পর শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সম্পত্তিহীন মজুর শ্রেণীর উদ্ভবের পর থেকে মজুরি সংক্রান্ত বিভিন্ন  তত্ত্বের জন্ম।

এ ব্যাপারে পথিকৃত্‍ যথারীতি অ্যাডাম স্মিথকেই বলা হয়। যদিও মজুরি তত্ত্ব সে সময় যথেষ্ট্ পরিস্কার হয়নি। স্মিথ তার সামগ্রিক তত্ত্বীয় কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবেই ভেবেছেন যে অন্যান্য পণ্যের দামের মতো বাজারে জোগান এবং চাহিদার মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই মজুরি নির্ধারিত হবে। মালিক ও মজুর নিজ নিজ স্বার্থেই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কে যাব এবং তাতে সবারই সর্বোচ্চ কল্যাণ হবে। এই বক্তব্য সুসংগঠিত তত্ত্বের মাধ্যমে উপস্থিত না করলেও তা পরবর্তীকালে অর্থশাস্ত্রে মূলধারার মজুরি তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এখানে অনুমান করা হয়েছে একটি নিখুঁত প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতি, যার অস্তিত্ব দুনিয়ার কোথাও ছিল না, এখানো নেই।

মজুরি তত্ত্বের মধ্যে টিকে থাকার তত্ত্বও স্মিথের ধারণা থেকেই গড়ে উঠেছে। এই তত্ত্ব শ্রমবাজারে চাহিদার চেয়ে জোগানের ওপর বেশি নির্ভর করেছে। এ তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রমিকদের জোগানের ওপর বেশি নির্ভর করে প্রকৃত মজুরি টিকে থাকার মাত্রায় থাকবে নাকি তারও নিচে চলে যাবে। স্মিথ বলেছেন, যে শ্রমিকদের মজুরি তাদের বেঁচে থাকা ও পুনরুত্‍পাদনের মতো যথেষ্ট হতে হবে। অন্যান্য ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ যেমন রিকার্ডো ও ম্যালথাসের মতামতে কিছু কিছু পার্থক্য ছিল। রিকার্ডো মনে করতেন, শ্রমের প্রাকৃতিক দামই হলো তার টিকে থাকার ও শ্রমিকের বংশবৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট দাম। ম্যালথাসের বক্তব্য ছিল এর কাছাকাছি। তার বক্তব্য ছিল, শ্রমের বাজার দাম খুব বেশি দিন প্রাকৃতিক দাম থেকে ভিন্ন থাকতে পারে না। যদি মজুরি টিকে থাকার মাত্রা থেকে বেশি হয় তাহলে বাজারে শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং মজুরি হার ঠিকই নেমে যাবে। আবার যদি মজুরি টিকে থাকার খুব নিচে নেমে যায় তাহলে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাবে এবং মজুরি হার আবার ঊধ্বগামী হবে। অর্থনীতিবিদেরা যখন এসব তত্ত্ব দিচ্ছিলেন তখন ইউরোপেই সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক টিকে থাকার চেয়ে অনেক কম মজুরি পাচ্ছিলেন। এই মজুরিকে যারা অনমনীয় বা অপরিবর্তনীয় মনে করতেন তাদের বক্তব্যের মজুরির লৌহ আইনের প্রবক্তা বলা হতো।

মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে মালিকেরা শুধু ভীত ছিলেন না, যে অর্থনীতিবিদেরা তখন ক্লাসিক্যাল অর্থশাস্ত্র নির্মাণ করছেন তাদেরও ধারণা ছিল, মজুরি বৃদ্ধি পেলে মুনাফার ভাগ সঙ্গে সঙ্গে কমে যাবে। পরে মার্কস পুঁজিবাদ বিকাশের কেন্দ্রীয় গতিশিলতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে মজুরি ও মুনাফা একই সঙ্গে বাড়তে পারে। মার্কসীর অর্থশাস্ত্রে মজুরিকে পুঁজিবাদে মূলধন সংবর্ধন প্রক্রিয়ার একটি গুরূত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই ধারার মতে, অর্থনীতিতে গতিশীলতা থাকলে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধিতেও মূলধন সংবর্ধন হ্রাস পায় না। মজুরি হচ্ছে শ্রমশক্তির পরিশোধিত অংশের মূল্য। এর পরিমাণ বা অনুপাত পূর্বনির্ধারিত নয়। এটা নির্ধারিত হয় শ্রমশক্তির জোগান, শ্রমশক্তির চাহিদা, প্রযুক্তিগত অবস্থান, সাংস্কৃতিক স্তর এবং সর্বোপরি শ্রমিক ও পুঁজিপতিদের আপেক্ষিক শক্তি বিন্যাসের ওপর। এই ধারার মতে, শ্রমিকেরা সংগঠিত ও শক্তিশালী অবস্থানে থাকলে পণ্যের মূল্যের ওপর তাদের অনুপাত বাড়বে কিন্তু মালিকানা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে কখনোই তারা তাদের শ্রমশক্তির পূর্ণ মূল্য পেতে পারবে না, এক প্রকাশ শ্রমদাসত্ব থেকেই যাবে।

সেই সময় পরিচিত আরেকটি তত্ত্ব হলো মজুরি-তহবিল তত্ত্ব। স্মিথ ও রিকার্ডো তাদের বক্তব্যে মজুরির জন্য নির্ধারিত তহবিলের ওপর যে গুরূত্ব দিয়েছেন তার ওপরই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত। এর মূল কথা হলো, মজুরি নির্ধারিত হয় তার জন্য নির্ধারিত তহবিল দ্বারা। এটি পুঁজিপতিদের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর  পর উদ্বৃত্ত এবং পুঁজির অংশ। নির্দিষ্ট সময়ে এর যেহেতু পরিবর্তন হয় না, সেহেতু এর পরিমাণ বেশি হলে গড় মজুরি বেশি হবে আর পরিমাণ কম হলে গড় মজুরি কম হবে। আবার অন্যদিকে মজুরের জোগান বেশি হয়ে গেলে মজুরি কমে যাবে এবং মজুরের জোগান কমে গেলে মজুরি বেড়ে যাবে। সুতরাং মজুরি বাড়াতে গেলে মূলধন বাড়ানোর শ্রমিকদের কাজ করাটাই গুরত্বপূর্ণ এবং একই কারণে আইন করে মজুরি বাড়ানো কার্যকর হবে না। ১৯৬৫ সালের পর সিনিয়র, মিল, থর্নটন, লঞ্জ এবং ওয়াকার এই তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তারা বলেন, শ্রমের চাহিদা মজুত তহবিল দিয়ে নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় ভোক্তাদের উত্‍পাদিত দ্রব্যের চাহিদার ভিত্তিতে। এর মধ্যে ১৯৬১ সালে মে দিবস রচিত হয় এবং আট ঘন্টা কাজের বিনিময়ে বেঁচে থাকার মজুরি নীতিগতভাবে স্বীকৃত হয়।

ত্রিশের দশকে মহামন্দার পর কেইনস ও অন্যরা ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারি ভোগ ও বিনিয়োগ ব্যায়ের গুরূত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। এই সময়ই দেখা যায় মজুরি কমালে কর্মসংস্থান বাড়াবে- এই তত্ত্ব ঠিক নয়। উপরন্ত এটি ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের মাধ্যমে অধিকতর বিনিয়োগের পথ বন্ধ করতে পারে। এটি ক্রয়ক্ষমতাতত্ত্ব নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব অবশ্য একক প্রতিষ্ঠান নয়, সমগ্র অর্থনীতি নিয়েই আলোচনা করে।

শ্রমের জোগানের নমনীয়তা খেয়াল করা দরকার। শ্রমের জোগান মজুরি ছাড়া আরও অনেক শর্তের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত, মজুরি ছাড়াও শ্রমের সময়, কাজের পরিবেশ, কাজের নিশ্চয়তা, কাজের অভিজ্ঞতার গুরূত্ব, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমের জোগান বিভিন্ন রকম করে থাকে। এ ছাড়া শ্রমের জোগানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ছাড়াও পেশাগত বা ভৌগোলিক বা সামাজিক বিভিন্ন উপাদান যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশে শ্রমের জোগানের বর্তমান ধারা খেয়াল করলে দেখা যাবে, কাজের চাহিদা এবং বিদ্যমান কাজে প্রকৃত আয়ের নিন্মমাত্রায় কারণে ভৌগলিক বা সামাজিক অচলতা এখন অনেকখানি অকার্যকর হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক চাপে পরিবারে ভাঙ্গন, পরিবার থেকে একাধিক সদস্যের ওপর কাজের চাপ ইত্যাদি এখন খুব পরিচিত ঘটনা। ঢাকায় কাজের খোঁজে মানুষের অব্যাহত প্রবাহ, শিশু-নারী-পুরূষ-বৃদ্ধ সবাই যে হারে কাজ খুঁজছেন সে হারে কাজ তৈরি হচ্ছে না। গার্মেন্টসে শিপমেন্টের সময় যে চাহিদা থাকা সেটা বছরের অন্য সময় থাকে না।

ন্যূনতম মজুরি বলতে বোঝায় এমন একটি আইনগত ব্যবস্থা, যা মজুরি কোনো পর্যায়ের নিচে নামবে না, সেটি নিশ্চিত করে। এই বক্তব্য প্রচলিত অর্থশাস্ত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী যে, বাজার অর্থনীতিতে বা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ন্যূনতম মজুরি বাজার পক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং এটি বাস্তবে মজুরির ক্ষেত্রে অনমনীয়তা তৈরি করে চাহিদা কমিয়ে দেয় এবং তার ফলে বেকারত্ব বাড়িয় দেয়। এ নিয়ে পাল্টামত যথেষ্ট জোরালো এবং তথ্যও তাকেই সমর্থন করে। ইতিমধ্যে প্রায়  সব শিল্পোন্নত দেশেই জাতীয় ন্যূনতম মজুরি চালু হয়েছে। এ ছাড়া নতুন শিল্পায়িত দেশগুলোতেও ন্যূনতম মজুরি আছে। ন্যূনতম মজুরি থাকা উচিত কি না তা নিয়ে অর্থশাস্ত্রে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও প্রাপ্ত তথ্য ও যুক্তি এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারের উদ্যোগ এর অস্তিত্বের পক্ষে। বছর দুয়েক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান অ্যালেন গ্রিন্সপ্যান কংগ্রেস কমিটিতে যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা থেকে এ রকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যে, ন্যূনতম মজুরি বাড়ালে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত কমবে। অন্যদিকে শিল্পোন্নত ১৭টি দেশের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই দেশগুলোতে ন্যূনতম মজুরি চালু আছে এবং এর যৌক্তিকতা হচ্ছে, এটি থাকলে মজুরি ভয়াবহ মাত্রায় নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না, এটি বরং শেষ পর্যন্ত উত্‍পাদনশীলতা বাড়ায় এবং তার মাধ্যমে কর্মসংস্থানও বাড়ায়।

বাংলাদেশে কোনো ন্যূনতম মজুরি নেই। না থাকাটা অর্থনীতির দুর্বলতা ও অসংগঠিত অবস্থাই নির্দেশ করে। গার্মেন্টস শ্রমিক বিদ্রোহের পর সেই খাতের শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে কেবল আলোচনা হচ্ছে। মালিকপক্ষ বলছে, মাসে এক হাজার ২০০ টাকার বেশি মজুরি বৃদ্ধি করলে এই শিল্প খাত ধসে পড়বে। প্রশ্ন হলো, মজুরি যদি না বাড়িয়ে ১০-১৫ বা ৩০ বছর আগের সমান রাখতে হয়, তাহলে মজুরি কত হওয়া উচিত? সর্বশেষ গার্মেন্টস কারখানায় মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৯৪ সালে, ৯৩০ টাকা। সে সময় থেকে দামস্তরের বৃদ্ধি এবং গার্মেন্টসের আয় যে ডলার দিয়ে হয় তার বাজারদর বিবেচনা করলে অঙ্ক বলে, মজুরি যদি এক হাজার ৮০০ টাকা হয়, মালিকদের দিক থেকে তা ১৯৯৩ সালের মজুরি ব্যায়ের প্রায় সমান হয়। অন্যদিকে আমরা যদি আরও আগে যাই, ১৯৬৯ সালে নূর খান কমিশন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করেছিল ১২৫ টাকা। বর্তমানে তার সমান ন্যূনতম মজুরি দিতে গেলে বর্তমান বাজারদরে দিতে হবে চার হাজার টাকার বেশি। টিকে থাকার হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি হবে। মালিকপক্ষ বলবে, এই টাকা দেওয়ার ক্ষমতা এই শিল্পের নেই। এই দাবি তথ্যসমর্থিত নয়। কারণ, এ সময়কালে চলতি বাজারদরে জিডিপি বেড়েছে ১০০ গুণেরও বেশি। গার্মেন্টস খাতের প্রবৃদ্ধির হার শিল্প খাতের অন্য যেকোনো উপখাত থেকে বেশি। শ্রমিকের আয়ের অনুপাত শুধুই  কমেছে। গত দুই দশকে আয় বন্টনের সরকারি হিসাবেও দেখা যায় জিডিপির মধ্যে আয়ের অনুপাত দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের জন্যই কমেছে। হিসাব বলে সে সময়ের শোষণের হার বাজার রাখলেও অঙ্ক অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি চার হাজার টাকা যুক্তিযুক্ত।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একটি বিশ্ব শিল্পের অংশ। এর মধ্য দিয়ে যে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হয় তার বিতরণ হয় বিশ্বব্যাপী। বিশ্ব বাজারের বিভিন্ন পক্ষ সম্পর্কে আমাদের সংগৃহীত তথ্য থেকে একটি গড় হিসাব দিই। বাংলাদেশের যে, তৈরি পোশাক কারখানা মালিক বিক্রি করছেন ১৫-২০ ডলারে, তা ইউরোপে বা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হচ্ছে ১০০ ডলারে। গড়ে তার মধ্যে ২৫-৩০ ডলার নিচ্ছে সেই রাষ্ট্র, ৫০-৬০ ডলার নিচ্ছে বিদেশি কোম্পানি এবং শ্রমিক পাচ্ছে আধা ডলারের কম।

উল্লেখ্য সারা বিশ্বে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরিই সর্বনিন্ম। বকেয়া, ওভারটাইম এসব প্রশ্ন তো থাকছেই। ক্ল্যাসিক্যাল অর্থশাস্ত্রের টিকে থাকার মজুরি কিংবা প্রাকৃতিক মজুরি কিংবা নব্য ক্ল্যাসিক্যালদের প্রান্তিক উত্‍পাদনশীলতা তত্ত্ব কোনোটিই এই অঙ্কের মজুরি সমর্থন করে না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো কৃষকেরা যেমন বহু স্তরের খাজনা জোগান দিয়ে সবার নিচে নিষ্পিষ্ট অবস্থায় ছিলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শ্রমিকের অবস্থাও তাই, পার্থক্য একটাই- এখন বড় ভাগিদার শুধু ব্রিটিশ নয়, এই খাজনাদারেরা বিশ্বব্যাপী ছড়ানো।

আনু মুহাম্মদ

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়