১১ মে, তারপর ২২, ২৩ ও ২৪ মে এবং তারও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় শ্রমিকেরা তাদের নানা দাবি আদায়ের জন্য যে আন্দোলন করেছে, সে আন্দোলনকে শ্রমিকের আন্দোলন বলে মেনে নিতে পারছে না মালিকগোষ্ঠী।
কোনো রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশের প্ররোচনায় এ আন্দোলন হয়েছে কি না তা অবশ্য তদন্তসাপেক্ষ। তবে আপাত বিবেচনায় বলা যেতে পারে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এখনো স্বল্পমূল্যের পোশাক তৈরির প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে অবর্তীণ হয়নি, যেখানে বাংলাদেশে স্বল্পমূল্যের পোশাকই বেশি তৈরি করে। তবে ভবিষ্যতে যে ভারত এ প্রতিযোগিতায় নামবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেহেতু ভারতেও আছে বাংলাদেশের মতো পর্যাপ্ত শ্রম সরবরাহ। তবে ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতেই বলবে। এ মুহুর্তে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের নষ্ট হওয়া ভাবমূর্তি থেকে ভারত কোনো ফায়দা লুটতে পারবে না। কেননা, স্বল্পমূল্যের পোশাকের অর্ডার সাধারণত খুব বড় হয়, যেহেতু এ ধরনের পোশাক ব্যাপক আকারে তৈরি হয় সাধারণ মানুষের জন্য। বড় অর্ডারের পোশাক তৈরির জন্য বড় পোশাক কারখানার প্রয়োজন, যা এখনো ভারতে সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয়ে ওঠেনি। তাই পাশ্ববর্তী দেশের প্ররোচণায় সাম্প্রতিককালের গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার সপক্ষে কোনো জোরালো যুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সম্প্রতিককালের শ্রমিক আন্দোলন যে শ্রমিককেরাই করছেন, তার জন্য একের অধিক জোরালো যুক্তি তুলে ধরা যায়। যেমন-
গার্মেন্টস শ্রমিকের অধিকারহীনতার নানা চিত্র থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শ্রমিকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দুই যুগেরও অধিক সময় ধরে এই অধিকারহীনতার কারণে তাদের মনে ক্ষোভ, দু:খ হতাশা পুঞ্জীভুত হতে থাকে, যা বিস্ফোরিত হয় ১১ মে ২০০৬ সালে।
আজ বাংলাদেশের তথ্যমাধ্যম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা এক বিরাট পরিবর্তন হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও মোবাইল টেলিফোন ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে। দেশে ও বিদেশে কী ঘটছে তা আজকের শিক্ষিত গার্মেন্টস শ্রমিকেরা জানেন। তাদের অনেকেই জানেন শ্রীলঙ্কা কিংবা অন্যান্য তৈরি পোশাক উত্পাদনকারী দেশে একজন গার্মেন্টস শ্রমিক কত বেতন পান। তা ছাড়া তারা জানেন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের জনগণ তাদের বিভিন্ন দাবি আদায়ের জন্য তীব্য আন্দোলন করছে। এই জ্ঞান তাদের উত্সাহ জুগিয়ে থাকবে তাদের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে।
মালিকগোষ্ঠী বলছে, আন্দোলনরতদের মধ্যে নারী শ্রমিক প্রায় দেখাই যায়নি, যেখানে গার্মেন্টস কারখানায় শতকরা ৮০ জনেরও অধিক হচ্ছেন নারী। সুতরাং এ আন্দোলন শ্রমিকেরা করেননি। গার্মেন্টস মালিকদের এই মতামতের বিপরীতে মনে করিয়ে দিতে হবে, যে কারখানাগুলোতে ভাঙচুর হয়েছে, সে কারখানাগুলো ছিল সোয়েটার কিংবা নিটওয়্যার কারখানা, যেখানে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই হচ্ছেন পুরূষ শ্রমিক। সাধারণত পুরূষ শ্রমিকেরা নারী শ্রমিকদের চেয়ে বিশি ট্রেড ইউনিয়নে যোগ দেন এবং আন্দোলন্ করেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারী শ্রমিককেও এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।
বিভিন্নভাবে বলা হচ্ছে, ১১ মে এসকিউ গ্রুপের যে কারখানায় শ্রমিকেরা প্রথম আন্দোলন শুরু করেন, সেই কারখানার শ্রমিকেরা মাসে সাত হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার টাকা রোজগার করেন, যেখানে গার্মেন্ট শিল্পে ন্যূনতম মজুরি হচ্ছে ৯৩০ টাকা। সুতরাং সেই কারখানায় বেতন বৃদ্ধির দাবি তোলে ভাঙচুর করা অবান্তর। কিন্তু এ কারখানায় পিস রেটে শ্রমিকেরা কাজ করেন। সোয়াটারের একটি অংশ সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হয় একজন শ্রমিকের প্রায় এক থেকে দেড় ঘন্টার শ্রম। মাসে সাত হাজার টাকা রোজগার করতে হলে তাকে প্রায় ৭০০ ঘন্টা এবং কোনো সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া দৈনিক প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা শ্রম দিতে হবে। তা ছাড়া দৈনিক ১৮ ঘন্টা পরিশ্রম করতে করেত এই শ্রমিক অতি অল্প দিনে মধ্যে নিজেকে নি:শেষ করে ফেলেন। তাই পিস রেটের হার বৃদ্ধির জন্য এ কারখানার শ্রমিকেরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত যখন দেখলেন মালিক কিছুতেই দাবি মানবেন না, তখনই তারা আন্দোলন শুরু করেন।
১১ মে এবং তার পরবর্তীকালের আন্দোলন যে শ্রমিকেরা করেননি তার সপক্ষে মালিকগোষ্ঠী আরও যুক্তি দেয় যে ইপিজেডের কারখানাগুলো সব সময়ই ইপিজেড এলাকার বাইরে অবস্থিত কারখানাগুলোর চেয়ে বেশি বেতন দেয়, ঠিক সময়ে বেতন দেয়, সাপ্তাহিক ছুটি দেয়, বোনাস দেয়। অর্থাত্ ইপিজেড এলাকার শ্রমিকেরা ইপিজেডের বাইরের এলাকার শ্রমিকদের চেয়ে সব অধিকারই বেশি ভোগ করেন। সুতরাং এখানকার শ্রমিকেরা আন্দোলন করতে পারেন না। কিন্তু ইপিজেড এলাকার শ্রমিকেরা মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনার লোকজন দ্বারা নানাভাবে নিগৃহীত হন। এ জন্য তাদের মধ্যেও ক্ষোভ জমা হয়। তাদের এ ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটেছে অন্যান্য কারখানায় শ্রমিক আন্দোলনের খবর পেয়ে। তা ছাড়া এক জায়গা যখন আগুন লাগে, তখন তা ভালো-খারাপ নির্বিশেষে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
মালিকেরা যুক্তি দিচ্ছেন যে গার্মেন্ট কারখানাগুলো হচ্ছে লাখ লাখ গরিব শ্রমিকের রুটি রোজগারের উত্স, যাদের আগে কোনো আয়ের পথই ছিল না। এই উত্স হারালে তারা আবার আয়হীন হবেন। সুতরাং এই ভাঙচুরের আন্দোলন শ্রমিকেরা করেননি, করেছে বাইরের কোনো শক্তি। এই যুক্তির বিরুদ্ধে একাধিক যুক্তি রয়েছে, যেগুলো পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেছে, শ্রমিকই তার নিজের আয়ের উত্স ধ্বংস করার জন্য তত্পর হয়েছিলেন। যেমন-
প্রথম গার্মেন্টস শ্রমিকদের শ্রমিকজীবন এত অল্প যে তারা কারখানাটিকে আপন করে তোলার যথেষ্ট সময় পায় না। বিআইডিএসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্র্রায় ১৬ ঘন্টা খেটে গার্মেন্ট শ্রমিকেরা অল্পদিনের মধ্যে নিজের শ্রমশক্তি নি:শেষ করে ফেলেন এবং গড়ে প্রায় চার বছরের চাকরি জীবনের মাথায় গার্মেন্টস কারখানার চাকরি থেকে বিদায় নেন।
দ্বিতীয়ত, আয়ের উত্সর প্রতি শ্রমিকের মমত্ববোধ গড় ওঠে, যদি সে আয়ের উত্স থেকে তারা শ্রমিকজীবনের সব অধিকার ভোগ করতে পারেন। কিন্তু আগের আলোচনা থেকে দেখা গেছে, গার্মেন্ট শ্রমিকেরা প্রায় সব শ্রম অধিকার থেকেই বঞ্চিত। তা ছাড়া সেই ১৬ বছর আগে তার অধিকারের যে অবস্থা ছিল, আজও প্রায় সেই একই অবস্থায় আছে। গার্মেন্ট কারখানা থাকে একজ শ্রমিক হাতে কিছু নগদ অর্থ ছাড়া আর কিছুই পান না।
পোশাকশিল্প ক্ষেত্রে ১১ মে এবং তার পরবর্তীকালের আন্দোলন যে প্রকতই শ্রমিক আন্দোলন ছিল, তা আরও প্রমাণিত হয় যখন দেখা যায়, এ আন্দোলনের পরেই সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি দলের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়, যেখানে শ্রমিকরা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। এই এমওইউ-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে-
১) শ্রমিককে নিয়োগপত্র এবং সার্ভিস বই প্রদান
২) সাপ্তাহিক ছুটি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান
৩) দৈনিক আট ঘন্টা কাজ এবং তার
অতিরিক্ত কাজ করলে ন্যায্যহারে ওভারটাইম মজুরি প্রদান
৪) আন্দোলনের জন্য কেউ
চাকরিচ্যুত হবে না এবং
৫) তিন মাসের মধ্যে নতুন ন্যূনতম মজুরি ধার্য করা।
এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার ও মালিকপক্ষ অত্যন্ত তত্পর হয়েছে। অথচ এই আন্দোলন আগমুহুর্ত পর্যন্ত মালিক বা সরকার কোনো পক্ষই গার্মেন্টস শ্রমিকদের বহুদিনের এই দাবিটি পূরণের জন্য কোনো তত্পরতা গ্রহণ করেনি।
এসব যুক্তির আলোকে বিচার করলে এতটুকুও বুঝতে কষ্ট হয় না যে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা ঘটিয়েছেন শ্রমিকেরাই, অন্য কেউ নয়। এটা একটা শুদ্ধ শ্রমিক আন্দোলন। মালিককে মানতে হবে এটা শ্রমিক আন্দোলন, সরকারকে মানতে হবে এটা শ্রমিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের জন্য আমাদের গর্ববোধ করা উচিত। কেননা, এখন আমাদের শ্রমিকেরা কেবল দুই হাত ও দুই পা বিশিষ্ট মাংসপিণ্ড নন। তারা অধিকার সচেতন তারা এখন সস্তা শ্রমিক নন, তারা এখন নিজেরাই দরকষাকষিতে সক্ষম (বারগেইল লেবার)।
তবে কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপই সমর্থনযোগ্য নয়। তা ছাড়া গার্মেন্টস শিল্পটি বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড। এই মেরুদন্ডের ওপর যেকোনো আঘাতই কঠোর হাত দমন করতে হবে। তাই ধ্বংসাত্মক শ্রমিক আন্দোলন কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। তবে শ্রমিকের আন্দোলন যাতে ধ্বংস পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে সেদিকে সযত্ন হতে হবে।
শ্রমিককে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করলেই শ্রমিক আন্দোলন ধ্বংস পর্যন্ত পৌঁছবে না। কেবল শ্রমিকের কল্যাণের জন্যই শ্রমিককে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করতে হবে তা নয়, মালিকের কল্যাণের জন্যও শ্রমিককে তাদর অধিকার প্রদান করতে হবে। কেননা, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রমিককে ন্যায্য অধিকার প্রদানের সঙ্গে শিল্পের উত্পাদনশীলতার দারূণ ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। তবে পোশাক শ্রমিককে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করার দায়িত্ব মালিক, দেশের সরকার, সুশীল সমাজ, এমনকি বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও।
তা ছাড়া এ ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান এনজিও, ট্রেড ইউনিয়ন, নারী প্রতিষ্ঠান সর্বোপরি শ্রমিকদেরও ভূমিকা রয়েছে। তারা সবাই একযোগে কাজ করলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারগুলো প্রদান করা অতিসহজ হবে।
প্রতিমাপাল মজুরদার
বিআইডিএস-এর লেখা থেকে