রিজওয়ান নীরা
ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে সালেহা। ঘরের কাজ সেরে, অসুস্থ বাবার প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের কাছে গুছিয়ে দিয়ে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে-গন্তব্য তেজগাঁওয়ের কোনো এক গার্মেন্টসে। চার মাস আগে এখানে সে সহকারী শ্রমিক সিহেবে কাজে যোগ দিয়েছে। অসুস্থ পঙ্গু বাবা ও তিন বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে স্বামী পরিত্যক্ত সালেহার সংসার যার পুরো দায় তার ওপর। সারা দিন পরিশ্রমের পর ক্লান্ত সালেহা। বাসায় ফিলে গত মাসের বেতন নিয়ে হিসাব করতে বসল। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শ্রমিক হিসেবে তার বেতন ৯৩০ টাকা।
আশপাশের বাড়ির কাঁথা-কাপড় সেলাই করে মাসে ২০০ টাকা পায়। অর্থাত্ সাহলেহার মোট উপর্জন ১ হাজার ১৩০ টাকা। এর মাঝে ৭০০ টাকা ঘর ভাড়া, অসুস্থ বাবার ওষুদ ও ছেলের বায়না মেটাতে খরচ হয়ে যায় প্রায় দেড়'শ টাকা। হাতে রাইল ২৮০ টাকা। তিনজনের এক মাসের খাবার খরচ। আবার কার কাছে দার করবে এই দুশ্চিন্তায় ডুবে যায় সালেহা। একসমুদ্র ভাবনা থেকে হঠাত্ জেগে উঠে সে। না, এভাবে চলবে না। সামনের দিনে খরচ বাড়বে বৈ কমবে না। এই বেতনে কীভাবে সম্ভব? কিছু একটা করতে হবে। গার্মেন্টসে শুনে এসেছে সালেহা, সব শ্রমিকের মনের চাপা ক্ষোভ দানা বাঁধছে। কিছু একটা হবে হোক, তাও যদি বেতন কিছুটা বাড়ে।
আমাদের দেশের পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে বড় ভূমিকা পালন করছে। বলতে গেলে, আমাদের শিল্পক্ষেত্রে পোশাক অগ্রগতির মূলে রয়েছে দেশের হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম। যদিও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তাদের মজুরি অনেক কম। মূলত পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা না থাকার মতো বেশকিছু দুর্ঘটনার রেশ ধরে শ্রমিকদের মনে অসন্তোষ জমতে থাকে, যা এক সময় আন্দোলনের রূপ নেয়। এখান থেকেই বেরিয়ে আসে অপেক্ষাকৃত কম মজুরির বিষয়টি। এ নিয়ে গত মে-জুন মাসে তীব্র শ্রমিক আন্দোলন শুরূ হয়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ৩১ মে বিচারক আনোয়ারূল হকের নেতৃত্বে মজুরি বোর্ড মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ, নিরপেক্ষ সদস্য ছাড়াও সরকারদলীয় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। মজুরি বোর্ড তিন বছর ধরে বাস্তবায়নের জন্য দেশের পোশাক খাতে শ্রমিকদের সর্বনিন্ম মজুরি সুপারিশ করেছে। অবশেষে ১৩ সেপ্টেম্বর তা প্রকাশিত হওয়ার কথা। এই প্রস্তাবে অদক্ষ, নতুন কিংবা সহকারী শ্রমিকদের প্রথম বছর মাসিক সর্বনিন্ম মজুরি নির্ধারিত হয়েছে ১ হাজার ৬০৪ টাকা। দ্বিতীয় বছর তার বেতন হবে ১ হাজার ৮৯০ টাকা এবং তৃতীয় বছর সর্বোচ্চ বেতন ২ হাজার ১১৭.৫০ টাকা। খসড়া সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম বছর নতুন অদক্ষ শ্রমিকের মাসিক মূল বেতন ১ হাজার ৪৭৫ টাকা। প্রতিবছর মূল বেতনের ৩০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ও ২০০ টাকা চিকত্সা ভাতা ধরা হবে। প্রথম বছর গণনা হবে সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণার দিন থেকে, দ্বিতীয় বছর ১ জুলাই ২০০৭ থেকে তৃতীয় বছর ধরা হবে ২০০৮ সালের ১ জুলাই।
এই প্রস্তাব নিয়ে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বোর্ড সদস্য আনুসিল হক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নাজমা আকতার এই প্রস্তাবের লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। মালিকপক্ষ মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪০০ দিতে সম্মত হয়েছে। অপরদিকে শ্রমিকপক্ষ দাবি করছে সর্বনিন্ম মোট মজুরি ২ হাজার ৬১০ টাকা। কিন্তু যাদের জন্য এই প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, তারা এসব আদৌ জানে কি? কিংবা এই প্রস্তাব কতটুকু তাদের পক্ষে? লালবাগ শহীদ নগরের বাসিন্দা আসমা আক্তার (১৭) কাজ করেন লালবাগস্থ আচৌকি অ্যাপারেল প্রাইভেট লিমিটেডে। মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করে তিনি পান মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা। তাদের জন্য প্রস্তাবিত মজুরি সম্পর্কিত কোনো তথ্যই তিনি জানেন না। তিনি জানান, পারিশ্রমিকের তুলনায় তার পরিশ্রম হয় তিনগুণ বেশি। এর চেয়ে বেশি মজুরি তাদের অবশ্যই প্রাপ্য। সঙ্গীতা, পনের বছর বয়সী এই কিশোরী চাকরি করে এলিফ্যান্ট রোডের ইএল গার্মেন্টসে। মাসিক ৮০০ টাকা মজুরিতে সুতা কাটে সঙ্গীতা। সে মজুরি বোর্ড প্রস্তাবিত মজুরি সম্পর্কে শুনেছে। কিন্তু সে জানে না আদৌ তা বাস্তবায়িত হবে কি না। কারণ, ছয় মাস যাবত্ তারা শুনে আসছে বেতন বাড়বে কিন্তু আজ পর্যন্ত এক টাকাও বাড়তি পায়নি তারা। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নাজমা আক্তার বলেন, আমি এই সুপারিশের সঙ্গে একমত নই। কারণ, এতে অনেক কম মজুরি ধরা হয়েছে। তবে তিনি শ্রমিকদের সত্ হয়ে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, এই সুপারিশ শ্রমিকেরা আন্দোলন করেই আদায় করেছে।