প্রখম পাতা কার্যাবলী সদস্য ফোরাম আমাদের কথা [ Register ]   English
 

গার্মেন্টস কারখানা কি শ্রমিকের মুত্যুফাঁদ?

 

আগুন লেগে বা দূর্ঘটনার শিকার হয়ে গার্মেন্টসের শ্রমজীবী নারী-পুরূষরা মারা যায়, একে আমরা নির্জলা মিথ্যা মনে করি। সত্য হচ্ছে মুনাফাখোর আর লুটেরা মালিকরা একের পর এক শ্রমিকদের হত্যা করছে। শ্রমিকদের জন্য গার্মেন্টস কারখানাগুলো যেন সাক্ষাত্‍ মৃত্যুকূপ।

মুনাফাকাক্ষী মালিক- যেকোনো পাকে-প্রকারে মুনাফা নিশ্চিত করাই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, কারখানাগুলোকে তারা পরিণত করেছে মৃত্যুকুপে। তাই আপাত চোখে একে দূর্ঘটনা মনে হলেও দ্বিধামুক্ত হয়ে আমরা বলতে চাই, দগ্ধ নারীদের, শ্রমিকের হাড়, গলিত লাশের ধারাবাহিক ও সমাকীর্ণ মিছিল নিছক কোনো দূর্ঘটনা নয়। এসব আসলে নিধনষজ্ঞ-পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই নিধনযঞ্জের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ শিকার হয়েছেন গাজীপুর রেডিয়েন্ট ফ্যাক্টরির তিন নারীশ্রমিক। এটি ঘটেছে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। এর ঠিক আগের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডটি ঘটে চট্টগ্রামের কেটিএস গার্মেন্টসসে। সেখানে গেল ২৩ ফেব্রুয়ারির অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬০ জন শ্রমিক, মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে আরো কয়েক শ শ্রমিকের ঘাম ঝরানো দেহ। আহত-নিহতের শরীর আগুনে পুড়ে এতটাই বীভত্‍স রূপ ধারণ করেছে যে, তাদের ঠিকমতো শনাক্ত করা ও সম্ভব হচ্ছে না । গার্মেন্টস কারখানায় এর আগে একসঙ্গে এতজন পুড়ে মরেনি।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ বছরে এমনই আগুনে পুড়ে, পায়ের নিচে চাপা পড়ে এবং ভবন ধসে মারা গেছে পাঁচ শতাধিক পোশাক শ্রমিক। বাংলাদেশের সেলাইশিল্পে ক্রমাগত এই মৃত্যুর মিছিলের পেছনে যেসব অবকাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা গেছে তা হলো কারখানাটির অপ্রশস্ত কাঠামো, একটিমাত্র সিঁড়ি দূর্ঘটনার সময় যা তালা মেরে বন্ধ রাখা হয়েছিল। অপরিকল্পিতভাবে ভবনটির সম্প্রসারণ ঘটানো, ডায়িং ইউনিটের রং, রাসায়নিক পদার্থ এবং কাপড়ের গাইট থেকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদি। আমরা মনে করি, সুস্পষ্টভাবেই এগুলো হত্যাকান্ডের শামিল অপরাধ।

শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ হিসাবে মানসম্পন্ন কারখানা তৈরিতে মালিকদের উদাসীনতাকে দায়ী করা হলেও মালিকপক্ষ এসবের পেছনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন। গার্মেন্টস মালিকরা আগুন লাগা কিংবা ভবন ধসে পড়াকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে চান। এমনকি ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে পড়ার সংবাদ দেশের গণমাদ্যমে প্রকাশিত কিংবা প্রচারিত হওয়া ঠিক হয়নি বলে মনে করেন অনেক মালিক।

কেটিএসে নিহত শ্রমিকদের বেশির ভাগ অর্থাত্‍ ৪৭ জনই নারী। কেন? জানা গেছে, পুরূষ সহকর্মীরা মাসের শুরূতে বেতন পেলেও নারীশ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী মাসের শেষ দিন পর্যন্ত। শাস্তির কারণে সময়মতো বেতন না পাওয়ায় ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে নারী শ্রমিকরা কেটিএস গার্মেন্টসে বেতনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এই অপেক্ষাই তাদের কাল হলো। গত ১৫ বছরে পাঁচ শতাধিক পোশাক-শ্রমিক বিভিন্ন দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, যাদের সিংহ ভাগই নারী।

তৈরি পোশাক খাতের দেড় হাজার কারখানাতেই শ্রমিকের কাজের কোনো পরিবেশ নেই। অলিগলিতে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় সুষ্ঠু অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। নব্বই শতাংশের বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে বাসাবাড়ির সাধারণ দালানকোঠায়, যা আদৌ কারখানার উপযোগী নয়। এসব কারখানায় অপ্রশস্ত জায়গায় একই সঙ্গে গাদাগাদি করে যন্ত্রপাতি স্থাপনের পাশাপাশি রাখা হয় কার্টন ভর্তি সুতা, কাপড়সহ পোশাক শিল্পের সব কাঁচামাল। দুইতলায় আবাসিক ভবন এবং ওপরের একটি তলায় গার্মেন্টস কারখানা চলছে এমন নজিরো আছে। এ বিষয়ে গত আড়াই দশকেও কোনো নিয়মনীতি তৈরি হয়নি। ১৯৯৭ সালে আইন ও সালিশকেন্দ্রের দায়ের করা মামলার রায়ে নির্গমন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ রায়ের পর প্রায় প্রতিটি ভবনের বাইরে নির্গমনের জন্য বিকল্প সিঁড়ি নামের যে লোহার সংকীর্ণ সিঁড়ি বসানো হয়েছে তা আরকটি মৃত্যুফাঁদ। কারণ, ওই সিঁড়িগুলোতে এতই সংকীর্ণ যে, ঠিকভাবে একজনও নামতে পারে না। সেগুলো আপত্‍কালে তা দূরের কথা, স্বাভাবিক সময়েও নামতে ভয় লাগে। স্পেকট্রাম ধসে পড়ার পর দাবি উঠেছিল কারখানা অভ্যন্তরে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে নিরাপত্তা সেল গঠন করা হোক, যাতে প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে তদারকি করা যায়। কিন্তু অধ্যাবধি তা গঠন করা হয়নি।

সবচেয়ে দু:খজনক যে, মালিকপক্ষ সিঁড়ি বানানো বা কারখানায় কিছু নিরাপত্তার ব্যবস্থা যে করতে তা কিন্তু নিজেদের তাগিদ বা শ্রমিকের নিরাপত্তার কথা ভেবে নয়, বরং বিদেশী ক্রেতাদের শর্ত পূরণের জন্য এসব করা হয়। বিদেশী ক্রেতারা আন্তর্জাতিক শ্রম মান ও স্থানীয় শ্রম আইন মেনে চলা, শ্রমিক সংগঠন করার অনুমোদন, নিয়োগপত্র দেওয়া, কাজের সময় ঠিক করা, সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং কারখানাকে নিরাপদ রাখার শর্ত আরোপ করায় মালিকরা বাধ্য হয় কারখানার পরিবেশ উন্নত করার।

মোট রপ্তানি আয়ের ৭৬ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। ১৮ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত তৈরি পোশাক খাতে, এদের ১৫ লাখই নারী শ্রমিক। শ্রমিকের মানবেতর জীবনযাপন, নিন্ম শ্রমমূল্য আর কারখানার নিকৃষ্ট পরিবেশ, একের পর এক দূর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু এসবের কোনোটিই নিজেদের ভোগ-বিলাসিতা থেকে মালিকদের বিরত রাখতে পারেনি। পোশাক মালিকরা আয় করছেন ডলারে। এর বিপরীতে পেয়েছেন স্থানীয় মুদ্রা। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন বা বিনিময় হারের সুবিধা পেয়েছেন তারা পুরো মাত্রায়। মূল্যস্ফীতিও তাদের স্পর্শ করেনি। আর শ্রমিকরা তাদের মজুরি পেয়েছেন টাকায়, মূল্যস্ফীতি যত বেড়েছে বাড়েনি তাদের শ্রমের মূল্য। গবেষণায় দেখা গেছে, একই কাজে নিয়োজিত পুরূষ শ্রমিক যে বেতন পান, পোশাক খাতের নারী শ্রমিকরা তার মাত্র ৬০ শতাংশ বেতন পান। এসব পরিসংখ্যান থেকে যে সিদ্ধান্ত উঠে আসে তা হলো আমাদের দেশের মালিকদের মধ্যে গার্মেন্টসকে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে ওঠেনি, তারা একে তাত্‍ক্ষনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। দীর্ঘমেয়াদি শিল্প হিসেবে বিবেচনা করলে তারা শ্রমিকের স্বাস্থ্য, কাজের পরিবেশ কার্যক্ষেত্রের নিরাপত্তা এসব নিয়ে ভাবতেন। জানা যায়, স্পেকট্রাম ভবন ধসে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচার পাওয়ায় বিদেশে বাংলাদেশের গার্মেন্টস বাজারের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে। অগ্নিকান্ড ও প্রাণহানির এসব ধারাবাহিক ঘটনা যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে দেশের ৭৬ ভাগ রপ্তানি আয়ের এই পোশাকশিল্পকে বিশ্ব বাজারে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তাই পরিস্থিতি উত্তরণে রাষ্ট্রের সর্বাধিক দায়িত্বের কথা আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।  

কেটিএস আর ফিনিক্স গ্রুপের ভবন ধসে নিহতদের লাশ যখন মর্গে, তখন মহান জাতীয় সংসদে ইমারত নির্মাণ (সংশোধন) বিল ২০০৬ পাস করানো হয়। আইনে নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মিত না হলে বা নকশা লংঘন করে ভবন বাড়ালে ভবনের মালিককে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, শুধূ আইন করে শাস্তির মেয়াদ বাড়ালেই চলবে না। আইনকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

শুধু ভবনের মালিক নয়, একই সঙ্গে ক্রটিপূর্ণ নকশা বা নকশা লংঘন করে ভবন নির্মাণ পরিদর্শন কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের শাস্তির বিধানও করতে হবে। অভিযোগ আছে, নতুন বাড়ি নির্মাণ বা পুরনো ভবনের অবস্থা রাজউক কখনোই পর্যবেক্ষণ করে না।

রপ্তানি অর্ডার দেওয়ার আগে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা এখন কারখানায় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। আর তাদের সন্তুষ্টির জন্যই প্রদর্শনী কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে হাতেগোনা কয়েকটি কারখানা। ঢাকার অদূরে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকায় উন্নত পরিবেশের কিছু কারখানা বিদেশী ক্রেতাদের ঘুরে দেখানো হয়, সন্তুষ্ট হয়ে তারা ফিরে যান। এগুলো দেখিয়ে মালিকরা বিদেশ থেকে প্রচুর রপ্তানি অর্ডার বাগিয়ে নেন। প্রদর্শনী কারখানার নামে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করতে হবে।

এ আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা দাবি জানাচ্ছি-

  • অনুমোদিত কোনো ভবনে গার্মেন্টস কারখানা চালানো যাবে না। কারখানায় শ্রমিকের জন্য সুষ্ঠু, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশের ব্যবস্থা করতে হবে।

  • প্রত্যেক কারখানা থেকে বের হওয়ার মাল্টিপল এক্সিটের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সিঁড়ি কতটা হবে তা নির্ভর করবে কারখানার আয়তন এবং সেখানে কত লোক কাজ করে, তার ওপর। জরূরি অবতরণের জন্য বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সিঁড়ি বন্ধ রাখা চলবে না।

  • প্রত্যেক গার্মেন্টসে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

  • নিহত ও আহত শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ দিতে হবে।

  • কেটিএস ও ফিনিক্স গার্মেন্টসের মালিকদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের ঘটনা না ঘটে।

  • দূর্নীতিবাজ কারখান পরিদর্শকদের অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে এবং তাদের বিরূদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • দূর্নীতিবাজ রাজউক কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

  • মজুরি প্রদানে নারী ও পুরূষ শ্রমিকদের বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে দূর করতে হবে। নারী শ্রমিকদের প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।