মিজানুর রহমান খান
বাংলাদেশের বিপর্যয়
শক্তিশালী মার্কিন টেক্সটাইল সংগঠন ন্যাশনাল কাউন্সিল অব টেক্সটাইল অর্গানাইজেশন্স (এনসিটিও) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক প্রচারণায় অবতীর্ণ রয়েছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, মূলত তাদের এ ভূমিকার ফলেই হংকংয়ে বাংলাদেশের বিপর্যয় ঘটে। একই কারণে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পোশাক বিলের ভবিষ্যত্ও অনিশ্চিত মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আফ্রিকার বিভ্রান্তিকর তুলনা
দেশ |
সুতির প্যান্ট |
মিশ্র কাপড়ের প্যান্ট |
মিশ্র নিউ শার্ট |
ওভেন শার্ট |
সুতি নিট শার্ট |
| বাংলাদেশ (ডজনপ্রতি মুল্কমুক্ত গড় মূল্য ডলারে) | ৫৬.৫৯ | ৩৮.৫৭ | ৩২.৪৪ | ৪৯.৭২ | ২৫.৬৪ |
| আফ্রিকা (ডজনপ্রতি শুল্কমুক্ত গড় মূল্য ডলারে) | ৬৮.৬৩ | ৫০.২৪ | ৪৯.৩২ | ৮২.৩০ | ৩৫.৮৯ |
| লেসেথো | ৬৬.৩৩ | ৫০.০০ | ৩৮.৬৯ | ০ | ৩১.৬৯ |
| কেনিয়া | ৬৫.৪৫ | ৪৯.৬০ | ৩৩.১৭ | ৫৮.৪১ | ৩২.৫৫ |
| মাদাগাস্কার | ৭১.৬৮ | ৪৭.৯০ | ৬৩.০৬ | ৮২.০১ | ৪১.৬৭ |
| সোয়াজিল্যান্ড | ৬৯.৬৩ | ৪৬.৬০ | ৪২.০১ | ৪৫.৩১ | ৩০.৫৮ |
| মরিশাস | ৮০.০৯ | ৫৭.১০ | ৬৯.৮৯ | ১৪৩.৪৪ | ৪২.৯৮ |
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সটাইল খাতের ১০০ সক্রিয় সদস্যের মোর্চা সংগঠন এনসিটিওর আশঙ্কা, বাংলাদেশকে শুল্কসুবিধা দিলে প্রকারান্তরে চীনই বিশেষ ফায়দা লুটবে। এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন এনিসটিও সভাপতি ক্যাস জনসন। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই ক্যাস জনসনের মদদেই পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের বিরোধিতায় শামিল হয়। জনসনের কথায়, দারূণ প্রতিযোগী বাংলাদেশকে যদি পোশাকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে মার্কিন আমদানিকারকরা আফ্রিকাকে ত্যাগ করবে। ঝুঁকবে বাংলাদেশের দিকেই। কারণ, তৈরি পোশাকের উল্লেখযোগ্য সব ক্যাটাগরিতেই বাংলাদেশ ১৮ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে আফ্রিকাকে টেক্কা দিচ্ছে।
১৫ ডিসেম্বর হংকংয়ে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে বিস্মিত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহলের মন্তব্য- এই প্রচারণা সত্যের অপলাপ, পুরোপুরি বিভ্রান্তিকর। ওই বিবৃতিতে শুল্কমুক্ত পোশাক রপ্তানি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আফ্রিকার পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় দেশের পোশাক রপ্তানির একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। বিজিএমইএর সদ্য বিদায়ী সভাপতি আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মি. জনসন মার্কিন টেক্সটাইল লবির ক্ষমতাধর মুখপাত্র। আমরা তার বক্তব্য অত্যন্ত গুরূত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। তবে তিনি আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যে তুলনামুলক পরিসংখ্যান দিয়েছেন তা সঠিক নয় বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। আমরা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষে আমাদের লবিষ্ট স্যান্ডলার ট্রাভিসা অ্যান্ড রোজেনবারিকে (এসটিআর) এ ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানাব। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই অবশ্য রোজেনবারির পক্ষে এ ইস্যুতে ফলপ্রসু কিছু করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন না। তাদের মতে, বিজিএমইএ এখনো অযথা কুহেলিকা সৃষ্টি করে চলেছে। এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, মি. জনসন হংকংয়ে এসেছিলেন কিন্তু আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। এর আগে আমরা তার সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু লবিষ্ট রোজেনবারি পরামর্শ দেয়, আরো কিছু প্রস্তুতি শেষে তার সঙ্গে কোনো বৈঠক অনুষ্ঠান ফলপ্রসু হতে পারে। আমরা ভবিষ্যতে তার সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী।
বিশ্ব পোশাক বাজারে চীনা প্রভূত্ব খর্ব করতেই যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম টেক্সটাইল লবি এনসিটিওর জন্ম। এনসিটিও একই লক্ষ্যে গত বছরে গঠিত গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ফেয়ার টেক্সটাইল ট্রেডের (জিএফটিটি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ৫২টি দেশের ৬৯টি ট্রেড বডি নিয়ে গঠিত এই সংস্থার একমাত্র কাজ হচ্ছে চীনকে ঠেকানো। হংকং সম্মেলনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, চীনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন বিধিনিষেধ আরোপের আগে এনসিটিও এ রকমই চীনবিরোধী নানা বিবৃতি ও প্রচারণা চালায়। তার অনেকটাই অবশ্য যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশকে যেভাবে তারা কোণঠাসা করছে তা দুর্ভাগ্যজনক। তিনি এনসিটিওর এই পরিসংখ্যানগত তুলনাপদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেন। তার কথা, বিশ্ব বাজারে প্রতিটি পোশাকের দাম ও স্বাতন্ত্র্য নির্ধারণের ১০ ডিজিট বা ১০ অঙ্কের একটি সংখ্যা ব্যবহার হয়। পোশাকের রকমভেদে এই অঙ্কের ক্রমিক সংখ্যা বদলে যাবে। কিন্তু এনসিটিও ডিজিটের বিষয়টি উপেক্ষা করে পাইকারি হারে যেভাবে গড় দাম নির্ধারণ করেছে তা হাস্যকর। তিনি বলেন, আমার শার্টের দাম ১০০ টাকা এবং আপনারটি ২০০ টাকা হতে পারে। কিন্তু যদি মানের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে কেউ শুধু দামের পার্থক্যের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে তাহলে তা যৌক্তিক হতে পারে না। ড. মুস্তাফিজুর রহমান প্রশ্ন রাখেন, বাংলাদেশের যে ১ ডজন ওভেন শার্টের গড় দাম প্রায় ৫০ ডলার, মরিশাস যদি একই মানসম্পন্ন শার্ট ১৪৩ ডলারে বিক্রি করে তাহলে মার্কিন আমদানিকারকরা কোন দু:খে মরিশাসের কাছ থেকে একই পোশাক কিনবে? তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মার্কিন সিনেটরেরা হয়তো এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ লেখচিত্র দেখেই সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশ তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। অনুসন্ধানে আরো দেখা যাচ্ছে, হংকং সম্মেলনকে সামনে রেখে এনসিটিও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ শুল্ক সুবিধাভোগী আঞ্চলিক জোটগুলোকে বাংলাদেশের বিরূদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে উত্সাহিত করে। মার্কিন টেক্সটাইল লবির বিরোধিতা যে এত গভীর ও তীব্রতা, বাংলাদেশ তা অনুভব করতে পারেনি। হংকং সম্মেলনে বাংলাদেশ তাই অ্যাম্বুশড (হতচকিত) হয়েছে। এ মন্তব্য সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী একজন বিশেষজ্ঞের।
এনসিটিওর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ৫ থেকে ১৯ ডিসেম্বর, ২০০৫ সালের মধ্যে অর্ধডজন বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। ৮ ডিসেম্বর ২৪ জন কংগ্রেসম্যান প্রেসিডেন্ট বুশের কাছে লেখা এক চিঠিতে টেক্সটাইল সংক্রান্ত দুটো ইস্যুতে হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এর একটিতে এলডিসিকে উন্নত বিশ্বের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধাদানে ইইউর প্রস্তাবের বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে রূখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। এই বিবৃতিও বাংলাদেশের প্রতিকূল যায়। বিজিএমইএ সূত্র বলেছে, এ ধরনের প্রচারণা খণ্ডন বা পাল্টা ব্যাখ্যাসংবলিত বিবৃতি প্রচারর করা তাত্ক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। ক্যাস জনসনের যুক্তি, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়াকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের নয়, চীনের পোয়াবারো ঘটবে। বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া চীনের কাছ থেকে তাদের বস্ত্র চাহিদার ৬০ শতাংশ আমদানি করে। এরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে মার্কিন বাজারে চীনের অনুপ্রবেশ আরো গভীর হবে।
এই বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করেন আনিসুল হক। তার দাবি, বাংলাদেশ বাজার সুবিধা হারালে চীনের বরং আরো লাভ হবে। কারণ, আফ্রিকার দেশগুলোর কাপড় নেই। তারা চীনের ওপর নির্ভরশীল। তখন দেখা যাবে, মার্কিন আমদানিকারকরা কাপড় ও পোশাক, দুটোই চীন থেকে কিনছে। জনসন আরো দাবি করেছেন, মার্কিন আমদানিকারকরা পশ্চিম হেমিস্ফিয়ারের (কানাডা, মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ৩৪টি দেশ) পোশাক প্রস্তুতকারী, যারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উপকরণ ব্যবহার করে তাদের এড়িয়ে চীন, বস্ত্র ব্যবহারকারী বাংলাদেশে ছুটবে। এর পরিণতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার ব্যাপাক চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটবে। আমেরিকার ম্যানুফ্যাকচারিং ট্রেড অ্যাকশন কোয়ালিশন অ্যামট্যাকের বিবৃতিতেও ক্যাস জনসনের এই বক্তব্য সমর্থিত হয়। ৫ ডিসেম্বর এনসিটিও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে যে, এলডিসিকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে আফ্রিকান এবং মিডল ইষ্টার্ন ও ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার ট্রেড প্রিফারেন্সেস ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। তুরস্কের টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল গ্রুপ আইটিকেইবি ওয়েস্টার্ন হেমিস্ফিয়ার ও আগোয়া'র সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের বিরূদ্ধে অবস্থান নেয়। হংকংয়ে এলডিসির সমন্বয়ক জাম্বিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী দীপক প্যাটেলের যুক্তি তাত্ক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিতেই এনসিটিও সভাপতি ক্যাস জনসন ১৫ ডিসেম্বর ওই বিবৃতি দেন। লক্ষণীয়, এ তুলনামূলক পরিসংখ্যানগত বিবৃতি তৈরির ক্ষেত্রে ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের পরিসংখ্যানকে ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিষ্ট ফার্ম রোজেনবারি বিজিএমইএর পক্ষে দুই বছর ধরে বাংলাদেশের জন্য তৈরি পোশাকে শুল্কসুবিধা নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত ফার্মটিকে প্রায় দেড় কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে মার্কিন সিনেট ও কংগ্রেসে বাংলাদেশের পক্ষে ট্রেড বিল উত্থাপন রোজেনবারির সাফল্য হিসেবে দাবি করা হয়ে থাকে। এই সংস্থা এর আগে শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া ও সাফটাভুক্ত একটি দেশের পক্ষে লবি করেছে।
আনিসুল হক বলেন, আমরা আগামী বছরের নভেম্বরের মধ্যে ট্রেড বিলের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফল আশা করছি। ওই সময় সিনেট নির্বাচন হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারনা, তুলনামূলক বিচারে রিপাবলিকানরাই বাংলাদেশের ট্রেড বিলের ব্যাপারে বেশি সহানূভূতিশীল থাকবে। বিজিএমইএর মতে, প্রস্তাবিত বিল অনেকটা দ্বিদলীয় হয়েছে। কারণ, এতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলীয় সদস্য রয়েছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের অনেকই এই বিলের ভবিষ্যত্ নিয়ে আশাবাদী হতে একেবারেই নারাজ।
বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেকোনো দেশকে বিশেষ সুবিধা দিতে তা কোনো না কোনোভাবে অন্য দেশের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে এলডিসিকে যাতে ত্যাগ না করা হয়, তার বিরূদ্ধে বাংলাদেশ সব সময় সোচ্চার থেকেছে। আফ্রিকান দেশগুলো ২০০১ সাল থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। কেনিয়া এ সুবিধা পেয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভারসাম্য তার অনুকূলে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, তখন কিন্তু এনসিটিও বলেনি যে, এটা তাদের দেওয়া যাবে না, কারণ এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা কিন্তু আফ্রিকা এখনো পাচ্ছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর বলেন, প্রথমেই আমাদের পাশে সরিয়ে রাখা হলো, আর এখন যখন আমরা সেই সুবিধার জন্য লবি করছি, তখন সমতার যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, এটা বৈষম্যমূলক।
সূত্র: প্রথম আলো